প্রণোয়তা

দিন শেষ খুঁজে দেখি হারিয়ে গেছি আম,
রাত হলেই হাতড়ে খুঁজি কোথাই আছো তুমি।
দিনে-রাতে শূন্য সবই, নিস্ক্রিয় আমি,
বিষক্রিয়া হয় না আমার মনোস্ক্রিয়া চলে।
নির্দ্বিধাতে বাঁধা ভেঙ্গে আনবো শরীর মাঝে,
এখন দিনে-রাতে বাড়ছ তুমি আমার হৃদকোমলে।

১৭ জুন ২০১৪ ইং

তুমিহীনতা

আমি আধো ঘুমে তোমার পানে এখনো চেয়ে আছি,
রাত বাড়লেই কষ্ট গুলো আমায় কাঁদাতে আসে।
পাঁশ ফিরে পাঁশবালিশে হাতটা রেখে ভাবি,
থাকলে তুমি আমার কাছে কষ্ট যেত বনবাসে।

সকাল হলেই সব ভুলে যায়, ব্যস্ত থাকি নিজের মাঝে,
নানা কাজে দিনের বেলায় অবহেলায় আসো না তো তুমি।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে, আসে গভীর রাত,
আমি আধো ঘুমে তোমার পানে চেয়ে থেকে যায়…।।

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর স্ত্রী’র কাছে শেষ চিঠি।

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর একটা অসম্ভব সুন্দর প্রেমের চিঠি লিখেছিলেন। তাঁর শেষ চিঠিঃ

প্রিয়তমা মিলি,

একটা চুম্বন তোমার পাওনা রয়ে গেলো….সকালে প্যারেডে যাবার আগে তোমাকে চুমু খেয়ে বের না হলে আমার দিন ভালো যায় না।আজ তোমাকে চুমু খাওয়া হয় নি।আজকের দিনটা কেমন যাবে জানিনা…..এই চিঠি যখন তুমি পড়ছো, আমি তখন তোমাদের কাছ থেকে অনেক দূরে।ঠিক কতটা দূরে আমি জানিনা।

মিলি, তোমার কি আমাদের বাসর রাতের কথা মনে আছে? কিছুই বুঝে উঠার আগে বিয়েটা হয়ে গেলো। বাসর রাতে তুমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে যখন কাঁদছিলে, আমি তখন তোমার হাতে একটা কাঠের বাক্স ধরিয়ে দিলাম। তুমি বাক্সটা খুললে….সাথে সাথে বাক্স থেকে ঝাকে ঝাকে জোনাকি বের হয়ে সারা ঘরময় ছড়িয়ে গেলো। মনে হচ্ছিলো আমাদের ঘরটা একটা আকাশ….আর জোনাকিরা তারার ফুল ফুটিয়েছে! কান্না থামিয়ে তুমিনবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলে, “আপনি এত পাগল কেনো!?” মিলি, আমি আসলেই পাগল….নইলে তোমাদের এভাবে রেখে যেতে পারতাম না।

মিলি, আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় দিন প্রিয় কন্যা মাহিনের জন্মের দিনটা। তুমি যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছিলে। বাইরে আকাশ ভাঙা বৃষ্টি….আমি বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে কষ্টে পুড়ে যাচ্ছি। অনেক্ষন পরে প্রিয় কন্যার আরাধ্য কান্নার শব্দ….আমার হাতের মুঠোয় প্রিয় কন্যার হাত! এরপর আমাদের সংসারে এলো আরেকটি ছোট্ট পরী তুহিন….মিলি, তুমি কি জানো….আমি যখন আমার প্রিয় কলিজার টুকরো দুই কন্যাকে এক সাথে দোলনায় দোল খেতে দেখি, আমার সমস্ত কষ্ট -সমস্ত যন্ত্রণা উবে যায়। তুমি কি কখনো খেয়াল করেছো, আমার কন্যাদের শরীরে আমার শরীরের সূক্ষ্ম একটা ঘ্রাণ পাওয়া যায়? মিলি…আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো।

আমার কন্যারা যদি কখনো জিজ্ঞেস করে, “বাবা কেন আমাদের ফেলে চলে গেছে?” তুমি তাদের বলবে, “তোমাদের বাবা তোমাদের অন্য এক মা’র টানে চলে গেছে….যে মা’কে তোমরা কখনো দেখো নি। সে মার নাম “বাংলাদেশ”। মিলি….আমি দেশের ডাককে উপেক্ষা করতে পারি নি।আমি দেশের জন্য জকে ছুটে না গেলে আমার মানব জন্মের জন্য সত্যিই কলঙ্ক হবে। আমি তোমাদের যেমন ভালোবাসি, তেমনি ভালোবাসি আমাকে জন্ম দেওয়া দেশটিকে। যে দেশের প্রতিটা ধুলিকনা আমার চেনা। আমি জানি….সে দেশের নদীর স্রোত কেমন…একটি পুটি মাছের হৃদপিন্ড কতটা লাল। ধানক্ষেতে বাতাস কিভাবে দোল খেয়ে যায়….।

এই দেশটাকে হানাদাররা গিলে খাবে, এটা আমি কি করে মেনে নিই?আমার মায়ের আচল শত্রুরা ছিড়ে নেবে….এটা আমি সহ্য করি কিভাবে মিলি?
আমি আবার ফিরবো মিলি….আমাদের স্বাধীনতার পতাকা বুক পকেটে নিয়ে ফিরবো।
আমি, তুমি, মাহিন ও তুহিন….বিজয়ের দিনে স্বাধীন দেশের পতাকা উড়াবো সবাই।তোমাদের ছেড়ে যেতে বুকের বামপাশে প্রচন্ড ব্যথা হচ্ছে…আমার মানিব্যাগে আমাদের পরিবারের ছবিটা উজ্জ্বল আছে। বেশি কষট হলে খুলে দেখবো বারবার।
ভালো থেকো মিলি….ফের দেখা হবে। আমার দুই নয়ণের মণিকে অনেক অনেক আদর।

ইতি,
মতিউর।
২০ শে আগস্ট, রোজ শুক্রবার,১৯৭১