চলচ্চিত্রের বংশীবাদক | অগস্ত লুমিয়ের – লুই লুমিয়ের

 

অগস্ত লুমিয়ের – লুই লুমিয়ের
অগস্ত লুমিয়ের – লুই লুমিয়ের

ফ্রান্সের লিয়ঁ শহরের চিত্রকর আঁতোয়া লুমিয়ের চিত্রকর্মে আর্থিক সুবিধা করতে পারছিলেন না। ফলে হুট করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন ছবি আঁকা ছেড়ে দেবেন। উপার্জন করাটা খুব বেশি জরুরী হয়ে পড়ছিল তাঁর। ফলে মনের গহীনে লালিত হওয়া আর্টের পথ ছেড়ে দিয়ে ফটোগ্রাফিক মাল মশলা তৈরি এবং এর সরবরাহ দেয়ার জন্য একটা প্রতিষ্ঠান খুলে বসলেন। রং তুলির শিল্পী মনের অজান্তে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বিস্ময়কর শিল্প মাধ্যম যাকে সপ্তম আর্টের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এবং যাকে ‘অষ্টম আশ্চর্য’ নামে সম্মানিত করা হয়েছে- সেই চলচ্চিত্র আবিষ্কারের পথটা সহজ ও সরল করে দিলেন এভাবেই। আজকের যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী এই শিল্প-মাধ্যমের আবিষ্কারের সঙ্গে ফ্রান্সের আঁতোয়া লুমিয়ের (১৮৪০-১৯১১) নাম কখনো উচ্চারিত হয় না বরং উচ্চারিত হয় তাঁর দুই সন্তান অগুস্ত লুমিয়ের (১৮৬২-১৯৫৪) এবং লুই লুমিয়েরের (১৮৬৪-১৯৪৮) নাম। কিন্তু আঁতোয়া’র মত পিতা না পেলে অগুস্ত এবং লুইয়ের সিনেমাটোগ্রাফের আবিস্কার হয়ত অনিশ্চিত হয়ে পড়তো আর স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবীর মানুষ চলচ্চিত্র শিল্পের স্বাদ আরো বিলম্বে পেতো।

ক্যামেরায় আঁতোয়া লুমিয়ের
ক্যামেরায় আঁতোয়া লুমিয়ের

আঁতোয়া লুমিয়ের রং-তুলি ছেড়েছিলেন এটা সত্য কিন্তু মনের মধ্যে প্রকৃতির যে সৌন্দর্য তাঁকে আলোড়িত করতো, সেই সৌন্দর্যের স্থায়িত্ব দেওয়ার জন্য তিনি ক্যামেরা হাতে নিয়েছিলেন এবং দীর্ঘ সাধনায় খ্যাতনামা ফটোগ্রাফারের স্তরে উন্নীত করলেন। আর অবিরাম পরিশ্রমে নিজের ফটোগ্রাফিক মান মশলা তৈরির প্রতিষ্ঠানটির আকার বড় হয়ে লাগলো। সে সময়ে প্রতিষ্ঠানটি হয়ে উঠে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফটোগ্রাফিক কারখানা। সবচেয়ে বড় কারখানা আমেরিকার নিউইয়র্কের জর্জ ইস্টম্যানের ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানির পরেই ছিল ের স্থান। আঁতোয়া লুমিয়ের’র দুই সন্তান আগুস্ত এবং লুই পিতার সঙ্গে মগ্ন হয়ে কাজ করতে শুরু করলেন নতু সৃষ্টির উদ্দীপনায়। বড় জন মুলত ম্যানেজারের ভূমিকা পালন করতেন আর ছোট জন পদার্থবিদ্যায় আবেশিত লুই নতুন আবিষ্কারের চিন্তায় মগ্ন রইলেন সারা সময়। তবে দুজনই ছিলেন একে অপরের পরিপূরক।

দাবা খেলায় মগ্ন অগুস্ত লুমিয়ের ও লুই লুমিয়ের
দাবা খেলায় মগ্ন অগুস্ত লুমিয়ের ও লুই লুমিয়ের

চলচ্চিত্র আবিষ্কারের শুরুর মাহেন্দ্রক্ষণটি ১৮৯৪ সালের গ্রীষ্মকালে। ইতোমধ্যে টমাস আলভা এডিসন (১৮৪৭-১৯৩১) ও ডব্লিউ কে এল ডিক্সন (১৮৬০-১৯৩৫) ১৮৮৮ সালে কিনোটোস্কোপ আবিস্কার করেছেন। পঞ্চাশ ফুট দৈর্ঘ্যের চলমান ছবি এই যন্ত্রের মাধ্যমে দেখা যেতো। বিশাল আকৃতির এই যন্ত্রটিতে কেবলমাত্র একজন এর ছবি দেখতে পেতেন। ১৮৯৪ গ্রীষ্মে টমাস আলভা এডিসন প্যারিসে কিনোটোস্কোপ-এর প্রদশর্নীতে আঁতোয়া লুমিয়েরকে আমন্ত্রণ জানালেন। প্রথমবারের মত তিনি কিনোটোস্কোপ প্রত্যক্ষ করে নিজ শহর লিয়ঁতে ফিরে এসে দুই সন্তানকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে শুধু বলেছিলেন, ‘তোমরা এর থেকে ভালো কিছু করার চেষ্টা কর। আমি তোমাদের সঙ্গে আছি’।

কিনোটোস্কোপ
কিনোটোস্কোপ

পিতার অনুপ্রেরণা গভীর উদ্দীপনার জন্ম দিল অগুস্ত ও লুই লুমিয়ের’র মনে। বিশেষ করে লুই যিনি পদার্থবিদ্যা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে ভালোবাসতেন। চলমান আলোকচিত্র গ্রহণের উপযোগী

ক্যামেরা আবিষ্কারের নেশায় দীর্ঘ গবেষণা ও পরিশ্রমের পর তিনি এক ধরণের ক্যামেরা ও প্রোজেক্টর যন্ত্রের আবিষ্কারে সফল হন। প্রখ্যাত সমালোচক ও চলচ্চিত্রের ঐতিহাসিক জর্জ সাঁসুল বলেছেন, লুই লুমিয়ের ডিটেলের প্রতি এত গভীর মনোযোগ দিয়েছিলেন বলেই প্রকৃত অর্থেই তাঁকে সত্যিকারের চলচ্চিত্রের প্রথম স্রষ্টা বলা য়ায। অগুস্ত লুমিয়েরও ছোট ভাইয়ের কৃতিত্ব বিন্যের সঙ্গে স্বীকার করে উল্লেখ করেছেন, তাঁর ভাই এক রাতের মধ্যে চলচ্চিত্র আবিষ্কার করেন। আর সেই রাতে সৃষ্টির বেদনায় লুই মাথার যন্ত্রণা এবং নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখেন খুবই কষ্ট পাচ্ছিলেন।

তবে এটা স্বীকার্য যে, চলচ্চিত্রের মত একটা জটিল বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হঠাৎ করে করো মাথায় এক রাতে আসেনি। বরং দীর্ঘ হাজার হাজার বছরে মানুষের চলমান দৃশ্যের স্থায়ী প্রতিফলনে যে স্বপ্ন ও আগ্রহ, এর ধারাবাহিকতার একটা চূড়ান্ত মুহূর্ত হতে পারে লুই লুমিয়ের’র অস্থির রাত।

‘সিনেমা’ শব্দটির উৎপত্তিগত বিষয়টি লক্ষ্য করলে আমাদের ফিরে যেতে হয় অনেক পেছনে। গ্রীক ‘কিনেমা’ শব্দটি থেকে ‘সিনেমা’ শব্দটি এসেছে; যার অর্থ ‘গতি’। আমরা যদি স্পেনের প্রাচীন গুহা আলতামিরায় ফিরে যায় তাহলে দেখি, একটি বাইসন দৌড়াচ্ছে; যার পায়ের সংখ্যা ছয়টি। দৌড়ানোর সময় নিশ্চয় আমাদের মনে হয় কোন প্রাণীর পায়ের সংখ্যা বেড়ে গেছে। হাজার হাজার বছরের প্রাচীন সেই গুহাশিল্পী হয়ত বাইসনের সেই গতির রূপটাই ধরতে চেয়েছিলেন।

লুমিয়েরদের ক্যামেরা
লুমিয়েরদের ক্যামেরা

যুগে যুগে আমরা গুহাচিত্র, ধোঁয়া-সংকেত (Smoke-Signal), চীনা ছায়া নাটক (Shadow-Play) বা মধ্যযুগের ম্যাজিক-লন্ঠনের (Magic-Lantern) মাঝে দেখি মানুষ কীভাবে ঘটমান গতিকে রূপ দিতে চেয়েছেন। কাঁচ ঘষে ছোট জিনিস বড় করে দেখা, অর্থাৎ ‘লেন্স’ আবিষ্কার, মানব সভ্যতার পুরনো এক আবিষ্কার। তবে ১৬৪০ সালে এথেন্সিয়াস কারচার তাঁর ম্যাজিক-লন্ঠনে যীশু’র জীবনের ঘটনাসমূহকে যখন একটা চলমান রূপ দেয়ার চেষ্টা নিয়েছিলেন, সেটাকে ঘটমান গতিকে ধরার একটা উল্লেখযোগ্য প্রয়াস বলতে হবে। আর এই ঘটমান গতিকে ধরাই হচ্ছে চলচ্চিত্র শিল্পের মূলকথা।

চলচ্চিত্র বিজ্ঞানের মূলসূত্র, ‘অবিরত দৃষ্টিতত্ত্ব’ (Persistence of Vision), প্রাচীনকাল থেকেই বিজ্ঞানীদের এই বিষয়টি ভাবিয়েছে। সহজভাবে বললে ‘অবিরত দৃষ্টিতত্ত্ব’ হচ্ছে- আমরা যখন একটা জিনিস দেখি এবং তা থেকে চোখ ফিরিয়ে অন্য আরেকটা ফিনিস দেখি; এ দুয়ের মাঝে আমাদের চোখে খুব সামান্য সময়ের জন্য হলেও(সেকেন্ডের ভগ্নাংশ) আগের দেখা চিত্রটার রেশ লেগে থাকে। চলচ্চিত্রে পর পর সাজানো একটা শট থেকে আরেকটা শটে দর্শককে টেনে নিয়ে যাওয়ার দৃষ্টি বিজ্ঞানগত ভিত্তিটা হচ্ছে- এই ‘অবিরত দৃষ্টিতত্ত্ব’। যুগে যুগে বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে মানুষের জ্ঞান বাড়াতে সাহায্য করেছেন। অ্যারিষ্টটাল ও আর্কিমিডিসের আলোকবিদ্যা, ইউক্লিডের আলোর গতির তত্ত্ব পেরিয়ে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ক্যামেরা ‘অবসকিউরা’-কে গ্রহণ করে, পরবর্তীকালে বিজ্ঞানীদের লেন্সের নানা গবেষণা এবং নিসেফোর নিপসের ফটোগ্রাফিক ইমেজকে ধারণ করে আজকের ফিল্ম ও চলচ্চিত্রের বিকাশের পথ সহজতর হয়। ফলে আজকের চলচ্চিত্রের আবিষ্কারের পথ হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের চিন্তা ও সাধনার সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য ঘটনা জরিয়ে রয়েছে। তারপরও যে সব সৃষ্টিশীল প্রাণে প্রত্যক্ষভাবে একে বর্তমান রূপ দিয়েছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে বলতে হয়, লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের ক্যামেরা, ইস্টম্যানের সংবেদনশীল ফিল্ম ও ম্যারের আবিস্কৃত প্রোজেক্টরের সংমিশ্রণেই আজকের চলচ্চিত্রের জন্ম। এর আগে প্রতিভাবান ক্যামেরাম্যান এতিয়েন মারে ফটোগান নামে রিপিট শট রাইফেলের মতো এক ধরনের ক্যামেরা আবিস্কার করেছিলেন যা দিয়ে পর পর গুলি ছোঁড়ার ভঙ্গিমায় এক সঙ্গে অনেকগুলা ফ্রেম শুট করা সম্ভাব ছিল। সে ক্যামেরা এখন আর ব্যবহৃত হয় না। কিন্তু চলচ্চিত্রের ‘শ্যুটিং’ শব্দটার উৎপত্তি ওখান থেকেই।

ওয়ার্কার্স লিভিং দ্য লুমিয়ের ফ্যাক্টরি
ওয়ার্কার্স লিভিং দ্য লুমিয়ের ফ্যাক্টরি

লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় তাদের প্রথম চলচ্চিত্রটি শ্যুট করেছিলেন ১৮৯৫ সালের ১৯ মার্চ। ১৫ মার্চ থেকে ২০ মার্চের মধ্যে তারা তাদের প্রথম চলচ্চিত্রটির সব কাজ শেষ করেন। ছবিটির নাম ওয়ার্কার্স লিভিং দ্য লুমিয়ের ফ্যাক্টরি। ওই দিনের যেহেতু ১৯ তারিখে ছাড়া প্রতিদিন বৃষ্টি হয়েছিলো সে জন্য ধারণা করা হয় সেই দিনই পৃথিবীর ইতিহাসে লুমিয়েরদের দ্বারা প্রথম ছবির শ্যুটিং হয়ছিল। মাত্র ৪৬ সেকেন্ডের ছবিটিতে দেখা যায় লুমিয়েরদের কারখানা থেকে শ্রমিকরা বের হচ্ছেন যাদের অধিকাংশই ছিলেন নারী শ্রমিক। তারা যখন কারখানা থেকে বের হচ্ছিলেন তখন কেউ-ই ক্যামেরার দিকে তাকাননি। ফলে ধারণা করা হয় তারা শ্যুটিং এর বিষয়টা জানতেন। শ্রমিক ছাড়াও ছবিটিতে দেখা যায় একটা কুকুর, একটা বাইসাইকেল এবং দুটো ঘোড়া। ফলে স্বাভাবতই বলা যায়, চলচ্চিত্রের প্রথম চরিত্র হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণী, কুকুর এবং ঘোড়া। পরবর্তীতে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় একক শর্টের মোট ১৪২৫টা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন; যার কোনটিরই দৈর্ঘ্য এক মিনিটের ঊর্ধ্বে নয়। তাদের ছবিগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-

  • এ ট্রেন রিচেস দ্য স্টেশন
  • এ বোট লিভস্ দ্য হারভার
  • বেবি অ্যাট ব্রেকফাস্ট টেবিল
  • ওয়াটারিং দ্য গার্ডের
  • হর্স ট্রিকস্
  • রাইর্ডাস
  • ফিশিং ফর গোল্ড ফিশ
  • ব্লাকস্মিথস্
  • জাম্পিং অন দ্য ব্লাংকেট
পৃথিবীর চলচ্চিত্রের প্রথম পোস্টের
পৃথিবীর চলচ্চিত্রের প্রথম পোস্টের

১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্যারিসের গ্র্যান্ড ক্যাফেতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম বারের মত অগুস্ত লুমিয়ের কুড়ি মিনিটের অনুষ্ঠানে তাঁদের নির্মিত দশটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী করেন। এরপর তারা প্যারিসের একটা প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেন। প্রথম কয়েকদিন দর্শকদের বিশেষ কোন ভিড় হয়নি, তারপর ধীরে ধীরে এটা এমনই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে যে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার ঢেউ ছড়িয়ে গোটা দুনিয়া জুড়ে।

লুমিয়েররা যথেষ্ট বুদ্ধিমান ও পাকা ব্যবসায়ীর মতো আগের বেশ কয়েকটি ক্যামেরা ও প্রোজেক্টর তৈরি করে রেখেছিলেন। তাদের বিশ্বাসী কিছু লোককে ক্যামেরাম্যান ও প্রোজেক্টর অপারেটরের কাজও শিখিয়ে রেখেছিলেন। এসব ট্রেনিংপ্রাপ্ত লোকদের মাধ্যমে লুমিয়েররা তাদের আবিষ্কৃত চলচ্চিত্র পাঠাতে লাগলেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।

ভারতবর্ষে লুমিয়েরদের প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হলো বোম্বাই শহরে ১৮৯৬ সালের ৭ জুলাই। যে কয়েকটি স্বল্প দৈর্ঘ্যর ছবি তখন দেখানো হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-

  • এ্যারাইভাল অফ এ ট্রেন
  • সী বেদার্স
  • লন্ডন গার্ল ড্যান্সার্স
  • ওয়াটারিং দ্য গার্ডেন

কোলকাতায় ছবিগুলা দেখানো হয় পরের বছর অর্থাৎ ১৮৯৭ সালে। ১৮৯৮ সালের ১৭ এপ্রিল বেডফোর্ড সিনেমাটোগ্রাফ কোম্পানি ঢাকায় ক্রাউন থিয়েটারে প্রথম চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী করে।

লুমিয়েররা আর্ক- লাইট প্রজেক্টরে তাঁদের ছবি দেখতেন। প্রতি সেকেন্ডে ১৬ ফ্রেম করে ছবি পর্দায় পড়তো। বর্তমানে প্রতি সেকেন্ডে ২৪ ফ্রেম করে পড়ে থাকে। ফলে তাদের ছবিগুলো দেখলে মনে হয় চরিত্ররা ছুটোছুটি করছে অর্থাৎ ফাস্ট মোশন হচ্ছে।

লুমিয়েরদের ১৪২৫টি ছবির মাধ্যমে সেই সময়ের ফ্রান্সের একটি চিত্র পাওয়া যায়। এর আগে ফটোগ্রাফি আবিস্কার হয়েছে ফলে স্থিরচিত্রের মাধ্যমে একটা সময়কে বুঝতে পারলেও চলচ্চিত্রের আবেদন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁদের এই ছবিতে কখনো কোন পেশাদার অভিনেতা বা অভিনেত্রীদের ক্যামেরার সামনে আনা হয়নি। বরং তাঁদের ঘর বাড়ি, রাস্তাঘাট থেকে আশেপাশের বিভিন্ন ধরনের সব ছবি তোলা হয়েছে। বেবী এ্য ব্রেকফাস্ট টেবিল এ দেখা যায়, স্বয়ং অঁগুস্ত লুমিয়ের ক্যামেরার সামনে। খাবার টেবিলে তাঁর বাম পাশে বসে থাকা একজন শিশুকে চা খাওয়াচ্ছেন। শিশুর পাশে বসে আছেন মার্গারেট নামের এক মহিলা। চিত্রে তিনজনের এই অন্তরঙ্গতা দেখে অনুমান করতে ভুল হয় না যে অঁগুস্ত লুমিরেরের পরিবার। ছবিতে বোঝা যায় ঘরের বাইরে লনে বসে তারা তাদের নাস্তা খাচ্ছেন। পেছনে গাছের দুলে ওঠা পাতার স্তির থেকে ছবিটি তোলা হয়েছে।

ওয়াটারিং দ্য গার্ডেন
ওয়াটারিং দ্য গার্ডেন

চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম কমেডি হচ্ছে ওয়াটারিং দ্য গার্ডেন ছবিটি। বাগানে মালি পাইপের মাধ্যমে ফুলের গাছে পানি দিচ্ছে। মগ্ন মালি যখন ব্যস্ত। তখনই এক দুষ্ট বালক পিছন থেকে এসে পাইপে পা দিয়ে চেপে ধরে। পানি বের না হওয়ায় মালি পাইপের নলে চোখ লাগিয়ে দেখার চেষ্টা করার সময়ই বালকটি পা টেনে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে পানির ঝাঁপটায় মালির চোখ মুখ আর কাপড় ভিজে যায়। তারপর শুরু হয় মালির ছেলেটিকে পাকড়াও করার দৃশ্য। ১৮৯৫ সালের ২৮  ডিসেম্বর লুমিয়ের ব্রাদার্সের প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে এই ছবিটি দেখানো হয় যা চলচ্চিত্রের মত নতুন একটা আবিস্কার দেখতে আসা উৎকণ্ঠিত দর্শকদের হাসির উপাদান যোগায়।

চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম কমার্শিয়ালও লুমিয়েররা তৈরি করেন। কমার্শিয়ালটির নাম কার্ড গেম তবে আশ্চর্যের বিষয় বিয়ারের এই বিজ্ঞাপন চিত্রে পর্দায় দেখা যায় লুমিয়েদের বাবা আঁতোয়া লুমিয়েরের এবং শ্বশুর ভ্যানক্লোয়ারকে। উল্লেখ্য, ভ্যানক্লোয়ারের দুই কন্যাকে দুই ভাই বিয়ে করেছিলেন। তাদের সাথে আরেকজন বসে তাস খেলছিলেন তবে তাঁর কোন পরিচয় পাওয়া যায় না। এই তিনজন ছাড়াও ফ্রেমে ওয়েটার থাকে যে বিয়ারের গুণগান বর্ণনা করতে দিয়ে অতি নাটকীয়ভাবে অভিনয় করেন।

লুমিয়েরদের তৈরি প্রথম মাস্টারপিস বলা যেতে পারে এ ট্রেন রিচেস দ্য স্টেশন ছবিটি। ফ্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢুকছে ক্যামেরা স্থির করে একই জায়গায় রাখা হয়েছে। কিন্তু ছবির কম্পজিশন ও ফ্রেমিং সত্যিই অপূর্ব। ট্রেন থামার পর যাত্রীর উঠানামা এবং ক্যামেরার সামনে দিয়ে যাত্রীদের একা অথবা দলবদ্ধভাবে হেঁটে চলা এত ছন্দময় যে দর্শকদের অভিভুত হতে হয়। সেই সাথে সাদাকালো রঙের ব্যবহার ছবিটির আবেদন অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। লুই লুমিয়ের নিজেই একজন খুব দক্ষ ফটোগ্রাফার ছিলেন। ফলে তাঁর মধ্যে ফ্রেমিং ের ধারণা খুবই সূক্ষ্ম ও যাথার্থ ছিল।

প্রথম দিককার কিছু ছবিতে ক্যামেরা স্থির থাকলেও পরের বেশ কিছু ছবিতে ক্যামেরা মুভ করেছে। এমনই একটি ছবিতে দেখা যায় ট্রামের লাইন ধরে ক্যামেরা এগিয়ে যাচ্ছে। সেই সময়কার প্যারিসের রাস্তার চিত্র ভেসে আসে পর্দায়। প্যারিসের রাস্তার ইতিহাসও খুঁজে পাওয়া যায় এ ছবিটি। মোটর গাড়ির পাশাপাশি ট্রাম এবং বিভিন্ন ধরনের ঘোড়ার গাড়ি দেখা যায় এই ছবিতে এবং সেই সাথে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়া পথচারী।

লুমিয়েরদের আরেকটি বিখ্যাত ছবি বয়েজ অন দ্য স্ট্রিট। ছবিটি সেই সময়ের ফ্রান্সের আর্থ-সামাজিক চিত্র দর্শকদের কাছে তুলে ধরে। ফুটপাতের ক্ষুধার্ত বালকগুলো একটি বল নিয়ে খেলছে। তাদের মধ্যে কেউ আবার মারামারি করছে। ছবিটি দেখে মনে হয় একশ বছর আগে ফ্রান্সের অসংখ্য শিশুর অবস্থা বর্তমানে আমাদের দেশে পথে পথে ঘুরে বেড়ানো শিশুদের মত ছিল।

ফ্রান্সের আভ্যন্তরীণ জীবন যাত্রা ক্যামেরায় তুলে ধরার পর লুমিয়েররা ক্যামেরা নিয়ে ফ্রান্স থেকে বের হলেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। আমেরিকা এমনকি মিশরে গেলেন ছবি তুলতে। মানুষজন, প্রাণী, রাস্তাঘাট, নদী, বন, সৈনিকদের ছবি তোলার সাথে সাথে সার্কাস দলেরও ছবি তুলছেন। মিশরে গিয়ে তুললেন পিরামিড ও স্ফিংস এর ছবি। ফলে তাদের ছবিগুলো নিছক বিনোদনের মাধ্যমে হলো না, বরং হলো এক ঐতিহাসিক দলিল।

এ্যারাইভাল অফ এ ট্রেন
এ্যারাইভাল অফ এ ট্রেন

অগুস্ত লুমিয়ের এবং লুই লুমিয়ের-এর অদ্ভুত আবিস্কার যখন পৃথিবীর মানুষের বিস্ময় সৃষ্টি করেছে এবং তাদের প্রচুর বিত্ত-বৈভবের মালিক বানিয়েছে, তখন বাবা আঁতোয়া লুমিয়ের নীরবে সন্তানদের সাফল্য দেখেছেন আর মনের আনন্দে সুখ অনুভব করেছেন। তিনি খুব গর্ব অনুভব করতেন যে, তাঁর দুই সন্তান তাঁর কথা রেখে পৃথিবীর মানুষের কাছে সম্মানিত করেছেন।

তরুণ বয়সে যে আঁতোয়া লুমিয়েরের গভীর উদ্দীপনা ছিল রং তুমি নিয়ে ছবি আঁকায়, তিনি জীবনের মাঝখানে নিজেকে ছবি আঁকা থেকে গুঁটিয়ে নিয়েছিলেন মূলত আর্থিক কারণে। তবে সন্তানদের সাফল্য এবং চলচ্চিত্র নিয়ে তাঁর স্বপ্ন পূরণ তাকে আবার পুরদস্তুর চিত্রশিল্পী বানিয়েছিল। ১৯১১ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি প্রায় সব সময়ই ছবি আঁকায় নিমগ্ন থাকতেন।

লুমিয়েরদের প্রদর্শিত প্রথম দশটি ছবিঃ

  • প্রান্ড ক্যাফে, প্যারিস
  • ওয়ার্কাস লিভিং দি লুমিয়ের ফ্যাক্টরি
  • হর্স ট্রিকস্ রাইডার
  • ফিশিং ফর গোল্ডফিশ
  • দ্য ডিজএমবার্কমেন্ট অফ দ্য কংগ্রেস অফ ফটোগ্রাফার্স ইন লিয়ঁ
  • ব্লাকস্মিথস্
  • দ্য গার্ডেনার
  • বেবী’স ব্রেকফাস্ট
  • জাম্পিং অন টু দ্য ব্লাংকেট
  • কার্ডিয়ার্স স্কোয়ার ইন লিয়ঁ
  • বাথিং ইন দ্য সি

লিও তলস্তয়েরঃ দ্য লাস্ট স্টেশন

ওয়ার অ্যান্ড পীস কিংবা আনা কারেনিনা খ্যাত ঔপন্যাসিক তথা রুশ সাহিত্যিক লিও তলস্তয়ের জীবনের পড়ন্ত বেলার মর্মস্পর্শী চিত্রায়নে চলচ্চিত্র দ্য লাস্ট স্টেশন।

দেশঃ জার্মানি, রাশিয়া ও যুক্তরাজ্য।
পরিচালকঃ মাইকেল হফম্যান।
লেখকঃ জেই পারিনির উপন্যাস অবলম্বনে মাইকেল হফম্যান।
রিলিজ ডেটঃ ২৩ ডিসেম্বর ২০০৯।
মুখ্য চরিত্রঃ ক্রিস্টোপার প্লামার, হেলেন মিরেন, কেরি কনডন।

The Last Station 2009
The Last Station 2009

কোন গাছের শিকড় কোন অন্ধকার হাতড়িয়ে দুর্ভেদ্য মাটি ভেদ করে অপর কোন গাছের শিকড়কে আঁকড়ে ধরে আছে কিনা তা নিয়ে মানুষের মাথাব্যাথাটা একটু কম। ব্যাথার বদলে মাথাভর্তি বুদ্ধি খেলা করে যায় সুন্দরবনের সুন্দরি গাছের ডালে মৌমাছির বাঁধা চাক দেখে। পরনে মোটা কাপড় পরে, হাত-পায়ে মোজা পরে সন্তর্পণে আগুনের ধোঁয়া দিতে হবে মৌমাছির চাকে। মধুকে বুকে আগলে প্রহরারত মৌমাছি জেই ভয়ে পালাবে এমনি লম্বা দা বের করে এক কোপে ডাল থেকে চাক আলাদা করে ঘরের ছেলে মৌমাছির দীর্ঘ পরিশ্রমের সঞ্চিত মধু পাত্রে ভরে নিয়ে ঘরে ফিরবে। তারপর প্রতি প্রত্যুষে উষ্ণ এক গ্লাস জলে দুফোঁটা মধুর সাথে কাগুজে লেবুর রস মিশিয়ে খেতে খেতে বলবে, বার বার বলি এত সঞ্চয় ভালো না তবু মৌমাছিরা সে কথা শুনল না। এখন দেখো কার চাষের ফলন কার গোলায় ওঠে। গোলায় যার ওঠে সে যেমন ভাবে এটা তার পৈতৃক সম্পত্তি, স্বাভাবিকভাবেই প্রাপ্য ঠিক তেমনিভাবে পুত্র-কন্যারা ভাবে বার্ধক্যে জ্বরাগ্রস্থ পিতা-মাতার সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিও একমাত্র তাদেরই প্রাপ্য। ফলে উইল বা দলিলনামা করে সেসব হস্তান্তর করা একান্তই অতি আবশ্যক। যার নামে উইল সেই বাবা-মা যদি জীবন সংগ্রামে লড়তে লড়তে সময়াভাবে উইল লেখার সময় নাও পায় তথাপি সুসন্তানেরা শুভস্য শীঘ্রম জ্ঞানে বাবা-মাকে দিয়ে জীবদ্দশায় করণীয় কাজ করিয়ে নেয়। হোক না হাসপাতালের বিছানায় বাবার মুমূর্ষুদশা, তবু ছেলে মেয়েদের তো জানা চাই বড় ভাই পাবে আমের বাগান নাকি মেঝ ছেলে পাবে উঠান সমেত টিন ছাদের মাটির দালান। মেয়ে জামাইরা যে বঞ্চিত হয়ে না সে নিশ্চয়তাও তো পাওয়া চাই। বাচ্চা না কাঁদলে নাকি প্রাণপ্রিয় মাও দুধ খেতে দেন না বলে হিসেবী সন্তানেরা এই সময় কিছুতেই বেহিসেবী হন না। বুকে যদি দম নিতে যেয়ে বুক বন্ধ হয়ে মরার দশাও হয় তথাপি মুমূর্ষু পিতার হাতে কলম তুলে দিয়ে দলিলে সই করিয়ে নিতে সন্তানরা মুহূর্তমাত্র কার্পণ্য করে না। ঝাপসা চোখে কাগজের লেখা লাইনগুলো আর পড়া হয় না। চোখ বেয়ে গড়িয়ে ঝরে অশ্রুধারা। হায়রে আমার জীবনভর পরিশ্রমের উপার্জন। এগুলোর শুধু মূল্য আছে। আমার কোন মূল্য নেই। সন্তানরা কেউতো আমায় চাইল না। ওদের মাকেও না। শুধুমাত্র চাওয়ার মধ্যে পার্থিব উপার্জন। অর্জনের কি কোন মূল্য নেই। আমার বেঁচে ওঠাটা ওদের কাছে কিছু না। মরে যাবার আগে সহায়-সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা করে দিয়ে যাওয়াটাই ওদের একমাত্র চাওয়া। এই আমবাগান, টিনচালের মাটির দালান, উত্তর পাড়ের শান বাধানো পুকুর, পাট বিক্রিত লাখ টাকা, বউয়ের আমার গয়না, গোয়ালের দশটা গরু আরও কর সব এতটা বছর যক্ষের ধনের মত বুক পেতে আগলালাম। এতসব কিছুর কিছুই আজ থেকে আর আমার না। ওদের মারও না। পিতৃস্নেহ-মাতৃস্নেহ কিছুই কিছু না। সহায় সম্পত্তিই সব। দলিল নামায় সাক্ষর দিতে চাই কিংবা না চাই সেসব কিছুই কিছু না। তবে এই মায়ার সংসারে আর কোন বাঁচি। সম্পদ পেলেই যদি ওরা সব পায় তবে আর আমার কোন বাঁধ সাধা। বাবার, হাতে তো আর শক্তি নেই। লিখতে পারার ক্ষমতাও নেই। তেমরাই হাতের মধ্যে কলম রেখে একটু শক্ত করে চেপে ধরো। লিখতে পারি না তো, তোমরাই লিখিয়ে নাও যেমনভাবে পারো তেমনভাবে। এত পরে কেন বুঝলাম জীবনভর ভস্মে ঢাললাম ঘি। দলিলনামায় স্বাক্ষর হয়ে গেল। বাবারা, সম্পত্তি আমায় ছেড়ে চলে গেল, আমার করা দলিলনামায় আমারই করা স্বাক্ষরের জরে। কিন্তু তোমারতো আমার উপার্জন না, অর্জন। আমার, তোমার মায়ের। এই অবেলায় তোমরা আমাদের ফেলে যেও না। সম্পদের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। এই যে আমরা আমাদের সারাটা জীবনের সমস্ত উপার্জন যে তোমাদের হাতে তুলে দিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম তথাপি আমরা সুখী, আমাদের হৃদয়ে তৃপ্তি। কারণ তোমরা আমাদের সন্তান। আমরা তোমাদের মা-বাবা। এই যে স্নেহের বন্ধন সেই বন্ধনের মাঝে দাড়িয়ে আজ পর্যন্ত কোন দলিলনামা তৈরি হয়নি যেখানে সি করলে আমরা তোমাদের থেকে আলাদা হতে পারি। পার্থিব সম্পদের ক্ষয় আছে, কিন্তু অর্জিত পুণ্যের কোন ক্ষয় নেই। দলিলের স্বাক্ষর ছাড়াই আমরা তোমাদের বাবা-মা, আর টা থাকবো আজীবন।

জীবনের টানাপোড়নের মাঝে বিশ্বসাহিত্য অঙ্গনের প্রবাদপুরুষ রুশ সাহিত্যিক লিও তলস্তয়কেও জীবনের শেষ বেলায় এরকমই একটি দলিলনামায় স্বাক্ষর করতে হয়েছিলো। দলিলে স্বাক্ষর করার কারণে লিও তলস্তয়ের উপর বয়ে যাওয়া ঝড় বাতাসের দোদুল্যমান অবস্থার আলোকে চলচ্চিত্র দ্য লাস্ট স্টেশন স্ত্রীবন্ধন হতে স্বামীর মুক্তি পাওয়াটা কত কঠিন তার আলোকে দ্য লাস্ট স্টেশন। একজন লেখক-কবি-সাহিত্যিকের কাছে বাস্তব পৃথিবী অপেক্ষা মনোজগৎ কত মূল্যবান রাত রাত আলোকে দ্য লাস্ট স্টেশন। ৮২ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকা “ওয়ার অ্যান্ড পীস” কিংবা “আনা কিরেনিনা” খ্যাত ঔপন্যাসিক লিও তলস্তয়ের জীবনের শেষ বছরের প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্র দ্য লাস্ট স্টেশন। ২০০৯ সালে লিও তলস্তয় চরিত্রে অভিনেতা ক্রিস্টোফার প্লামার এবং লিও তলস্তয় পত্নী সোফিয়া তলস্তয় চরিত্রে অভিনেতা হেলেন মিরেন অভিনীত চরিত্র দু’টি অস্কার পুরুস্কারের জন্যে মনোনীত হওয়া চলচ্চিত্র দ্য লাস্ট স্টেশন। ঔপন্যাসিক জেই পারিনি রচিত জীবনী আশ্রায়ী উপন্যাস দ্য লাস্ট স্টেশনের আলোকে পরিচালক মাইকেল হফম্যান পরিচালিত চলচ্চিত্র দ্য লাস্ট স্টেশন। যুদ্ধমগ্ন ধারিত্রীতে শান্তির বারতা ছড়িয়ে দেওয়া, জীবদ্দশায় সমগ্র ইউরোপের আত্নার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা লিও তলস্তয়ের শেষ দিন-রাত্রিগুলোর মরমীয় মর্মগাথা চলচ্চিত্র দ্য লাস্ট স্টেশন।

IMDb

Download

সাধারণ মেয়ে – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমি অন্তঃপুরের মেয়ে,
চিনবে না আমাকে।
তোমার শেষ গল্পের বইটি পড়েছি, শরৎবাবু ,
‘বাসি ফুলের মালা’।
তোমার নায়িকা এলোকেশীর মরন দশা ধরেছিল
পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে।
পঁচিশ বছর বয়সের সংগে ছিল তার রেশারেশি—
দেখলেম তুমি মহদাশয় বটে,
জিতিয়ে দিলে তাকে।।

নিজের কথা বলি।
বয়স আমার অল্প।
একজনের মন ছুঁয়েছিল
আমার এই কাঁচা বয়সের মায়া।
তাই জেনে পুলক লাগলো আমার দেহে—-
ভুলে গিয়েছিলেম অত্যন্ত সাধারণ মেয়ে আমি,
আমার মত এমন আছে হাজার হাজার মেয়ে,
অল্প বয়সের মন্ত্র তাদের যৌবনে।।

তোমাকে দোহাই দেই,
একটি সাধারন মেয়ের গল্প লেখো তুমি।
বড়ো দুঃখ তার।
তারও স্বভাবের গভীরে
অসাধারণ যদি কিছু তলিয়ে থাকে কোথাও
কেমন করে প্রমাণ করবে সে–
এমন কজন মেলে যারা তা ধরতে পারে!
কাঁচা বয়সের জাদু লাগে ওদের চোখে,
মন যায় না সত্যের খোঁজে–
আমরা বিকিয়ে যাই মরীচিকার দামে।।

কথাটা কেন উঠল তা বলি।
মনে করো, তার নাম নরেশ।
সে বলেছিল, কেউ তার চোখে পড়েনি আমার মতো।
এতবড়ো কথাটা বিশ্বাস করব যে সাহস হয় না,
না করব যে এমন জোর কই।।

একদিন সে গেল বিলেতে।
চিঠিপত্র পাই কখনো বা ।
মনে মনে ভাবি, রাম রাম, এত মেয়েও আছে সে দেশে,
এত তাদের ঠেলাঠেলি ভিড়!
আর, তারা কি সবাই অসামান্য–
এত বুদ্ধি এত উজ্জ্বলতা!
আর, তারা সবাই কি আবিষ্কার করেছে এক নরেশ সেনকে
স্বদেশে যার পরিচয় চাপা ছিল দশের মধ্যে।।

গেল মেল্‌’এর চিঠিতে লিখেছে,
লিজির সঙ্গে গিয়েছিল সমুদ্রে নাইতে
(বাংগালি কবির কবিতার ক লাইন দিয়ছে তুলে,
সেই যেখানে ঊর্বশী উঠছে সমুদ্র থেকে)
তার পরে বালির ‘পরে বসল পাশাপাশি—-
সামনে দুলছে নীল সমুদ্রের ঢেউ,
আকাশে ছড়ানো নির্মল সুর্যালোক।
লিজি তাকে খুব আস্তে আস্তে বললে,
‘এই সেদিন তুমি এসেছ, দুদিন পরে যাবে চ’লে—
ঝিনুকের দুটি খোলা,
মাঝখানটুকু ভরা থাক্‌
একটি নিরেট অশ্রুবিন্দু দিয়ে,
দুর্লভ, মূল্যহীন।‘
কথা বলবার কী অসামান্য ভঙ্গী!
সেই সঙ্গে নরেশ লিখেছে,
‘কথাগুলি যদি বানানো হয় দোশ কী,
কিন্তু চমৎকার–
হীরে-বসানো সোনার ফুল কি সত্য, তবুও কি সত্য নয়?’

বুঝিতেই পারছ
একটা তুলনার সংকেত ওর চিঠিতে একটা অদৃশ্য কাঁটার মতো
আমার বুকের কাছে বিধিয়ে দিয়ে জানায়–
আমি অত্যন্ত সাধারন মেয়ে।
মূল্যবানকে পুরো মূল্য চুকিয়ে দেই
এমন ধন নেই আমার হাতে।
ওগো, না হয় তাই হল,
না হয় ঋনীই রইলেম চিরজীবন।।

পায়ে পড়ি তোমার, একটা গল্প লেখো তুমি শরৎবাবু,
নিতান্ত সাধারন মেয়ের গল্প–
যে দূর্ভাগিনীকে দূরের থেকে পাল্লা দিতে হয়
অন্তত পাঁচ-সাতজন অসামান্যার সঙ্গে–
অর্থাৎ সপ্তরথিনীর মার।
বুঝে নিয়েছি আমার কপাল ভেঙ্গেছে,
হার হয়েছে আমার।
কিন্তু, তুমি যার কথা লিখবে
তাকে জিতিয়ে দিয়ো আমার হয়ে–
পড়তে পড়তে বুক যেন ওঠে ফুলে।
ফুলচন্দন পড়ুক তোমার কলমের মুখে।।

তাকে নাম দিয়ো মালতী
ওই নামটা আমার ।
ধরা পড়বার ভয় নেই।
এমন অনেক মালতী আছে বাংলাদেশে,
তারা সবাই সামান্য মেয়ে,
তারা ফরাসি জর্মান জানে না ,
কাঁদতে জানে।।

কী করে জিতিয়ে দেবে?
উচ্চ তোমার মন, তোমার লেখনী মহীয়সী।
তুমি হয়তো ওকে নিয়ে যাবে ত্যাগের পথে
দুঃখের চরমে, শকুন্তলার মত।
দয়া করো আমাকে।
নেমে এস আমার সমতলে।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে রাত্রির অন্ধকারে
দেবতার কাছে যে অসম্ভব বর মাগি
সে বর আমি পাব না,
কিন্তু পায় যেন তোমার নায়িকা।
রাখো-না কেন নরেশকে সাত বছর লন্ডনে,
বারে বারে ফেল করুক তার পরীক্ষায়,
আদরে থাক আপন উপাসিকামন্ডলীতে।

ইতিমধ্যে মালতী পাশ করুক এম.এ.
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে,
গণিতে প্রথম হোক তোমার কলমের এক আঁচড়ে।
কিন্তু, ওই খানেই যদি থামো
তোমার সাহিত্যসম্রাট নামে পড়বে কলংক।
আমার দশা যাই হোক,
খাটো কোরো না তোমার কল্পনা–
তুমি তো কৃপন নও বিধাতার মতো।

মেয়েটাকে দাও পাঠিয়ে য়ুরোপে।
সেখানে যারা জ্ঞানি, যারা বিদ্বান, যারা বীর,
যারা কবি, যারা শিল্পী, যারা রাজা,
দল বেঁধে আসুক ওর চার দিকে।
জ্যোতির্বিদের মতো আবিষ্কার করুক ওকে—
শুধু বিদুষী ব’লে নয়, নারী ব’লে;
ওর মধ্যে যে বিশ্ববিজয়ী জাদু আছে
ধরা পড়ুক তার রহস্য–মূঢ়ের দেশে নয়–
যে দেশে আছে সমজদার, আছে দরদি,
আছে ইংরেজ, জর্মন, ফরাসি।

মালতীর সম্মানের জন্য সভা ডাকা হোক-না–
বড় বড় নামজাদার সভা।
মনে করা যাক সেখানে বর্ষণ হচ্ছে মুষুলধারে চাটুবাক্য,
মাঝখান দিয়ে সে চলেছে অবহেলায়
ঢেউয়ের উপর দিয়ে যেন পালের নৌকা।
ওর চোখ দেখে ওরা করছে কানাকানি–
সবাই বলছে, ভারতবর্ষের সজল মেঘ আর উজ্জ্বল রৌদ্র
মিলেছে ওর মোহিনী দৃষ্টিতে।
(এইখানে জানান্তিকে বলে রাখি,
সৃষ্টিকর্তার প্রাসাদ সত্যই আছে আমার চোখে।
বলতে হল নিজের মুখেই–
এখনো কোনো য়ুরোপীয় রসজ্ঞের
সাক্ষাৎ ঘটে নি কপালে।।)
নরেশ এসে দাঁড়াক সেই কোনে,
আর তার সেই অসামান্য মেয়ের দল।।

আর, তার পরে?
তারপরে আমার নটেশাকটি মুড়োল।
স্বপ্ন আমার ফুরোল।
হায় রে সামান্য মেয়ে,
হায় রে বিধাতার শক্তির অপব্যয়।।

পরানের গহীন ভিতর – সৈয়দ শামসুল হক


জামার ভিতর থিকা যাদুমন্ত্রে বারায় ডাহুক,
চুলের ভিতর থিকা আকবর বাদশার মোহর,
মানুষ বেবাক চুপ, হাটবারে সকলে দেখুক
কেমন মোচর দিয়া টাকা নিয়া যায় বাজিকর।
চক্ষের ভিতর থিকা সোহাগের পাখিরে উড়াও,
বুকের ভিতর থিকা পিরীতের পুন্নিমার চান,
নিজেই তাজ্জব তুমি একদিকে যাইবার চাও
অথচ আরেক দিকে খুব জোরে দেয় কেউ টান।
সে তোমার পাওনার এতটুকু পরোয়া করে না,
খেলা যে দেখায় তার দ্যাখানের ইচ্ছায় দেখায়,
ডাহুক উড়াইয়া দিয়া তারপর আবার ধরে না,
সোনার মোহর তার পড়ে থাকে পথের ধুলায়।
এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর
যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর।।


আন্ধার তোরঙ্গে তুমি সারাদিন কর কি তালাশ?
মেঘের ভিতর তুমি দ্যাখ কোন পাখির চক্কর?
এমন সরল পথ তবু ক্যান পাথরে টক্কর?
সোনার সংসার থুয়া পাথারের পরে কর বাস?
কি কামে তোমার মন লাগে না এ বাণিজ্যের হাটে?
তোমার সাক্ষাৎ পাই যেইখানে দারুণ বিরান,
ছায়া দিয়া ঘেরা আছে পরিস্কার তোমার উঠান
অথচ বেবাক দেখি শোয়া আছে মরনের খাটে।
নিঝুম জঙ্গলে তুমি শুনছিলা ধনেশের ডাক?
হঠাৎ আছাড় দিয়া পড়ছিল রূপার বাসন?
জলপির গাছে এক কুড়ালের কোপের মতন
তাই কি তোমার দেহে ল্যাখা তিন বাইন তালাক?
এমন বৃক্ষ কি নাই, যার ডালে নাই কোন পরী?
এমন নদী কি নাই, যার বুকে নাই কোন তরী?


সে কোন বাটিতে কও দিয়াছিলা এমন চুমুক
নীল হয়া গ্যাছে ঠোঁট, হাত পাও শরীল অবশ,
অথচ চাও না তুমি এই ব্যাধি কখনো সারুক।
আমার জানতে সাধ, ছিল কোন পাতার সে রস?
সে পাতা পানের পাতা মানুষের হিয়ার আকার?
নাকি সে আমের পাতা বড় কচি ঠোঁটের মতন?
অথবা বটের পাতা অবিকল মুখের গড়ন?
তুঁতের পাতা কি তয়, বিষনিম, নাকি ধুতুরার?
কতবার গেছি আমি গেরামের শ্যাষ সীমানায়
আদাড় বাদার দিয়া অতিঘোর গহীন ভিতরে,
কত না গাছের পাতা কতবার দিয়াছি জিহ্বায়,
এমন তো পড়ে নাই পানি এই পরানে, শিকড়ে।
তয় কি অচিন বৃক্ষ তুমি সেই ভুবনে আমার,
আমারে দিয়াছো ব্যাধি, নিরাময় অসম্ভব যার?


আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় ক্যান,
ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরা শোয়,
ঘরের বিছান নিয়া ক্যান অন্য ধানখ্যাত রোয়?
অথচ বিয়ার আগে আমি তার আছিলাম ধ্যান।
আছিলাম ঘুমের ভিতরে তার য্যান জলপিপি,
বাঁশির লহরে ডোবা পরানের ঘাসের ভিতরে,
এখন শুকনা পাতা উঠানের পরে খেলা করে,
এখন সংসার ভরা ইন্দুরের বড় বড় ঢিপি।
মানুষ এমন ভাবে বদলায়া যায়, ক্যান যায়?
পুন্নিমার চান হয় অমাবস্যা কিভাবে আবার?
সাধের পিনিস ক্যান রঙচটা রদ্দুরে শুকায়?
সিন্দুরমতির মেলা হয় ক্যান বিরান পাথার?
মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর
নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর।।


তোমার দ্যাশের দিকে ইস্টিশানে গেলেই তো গাড়ি
সকাল বিকাল আসে, এক দন্ড খাড়ায়া চম্পট,
কত লোক কত কামে দূরে যায়, ফিরা আসে বাড়ি-
আমার আসন নাই, যাওনেরও দারুন সংকট।
আসুম? আসার মতো আমি কোনো ঘর দেখি নাই।
যামু যে? কোথায় যামু, বদলায়া গ্যাছে যে বেবাক।
কেমন তাজ্জব সব পাল্টায়া যায় আমি তাই
দেইখাছি চিরকাল। পরানের ভিতরে সুরাখ-
সেখানে কেবল এক ফরফর শব্দ শোনা যায়,
পাখিরা উড়াল দিয়া গ্যাছে গিয়া, এখন বিরান,
এখন যতই আমি ছড়া দেই কালিজিরা ধান,
সে কি আর আঙিনায় ফিরা আসে? আর কি সে খায়?
সকাল বিকাল গাড়ি, চক্ষু আছে তাই চক্ষে পড়ে;
পলকে পলকে গাড়ি সারাদিন মনের ভিতরে।।


তোমার খামাচির দাগ এখনো কি টকটাকা লাল,
এখনো জ্বলন তার চোৎরার পাতার লাহান।
শয়তান, দ্যাখো না করছ কি তুমি কি সোন্দর গাল,
না হয় দুপুর বেলা একবার দিছিলাম টান?
না হয় উঠানে ছিল লোকজন কামের মানুষ,
চুলায় আছিল ভাত, পোলাপান পিছের বাগানে,
তোমারে পরান দিছি, তাই বইলা দেই নাই হুঁশ,
আমি তো তোমারে নিতে চাই নাই ঘরের বিছানে।
হ, জানি নিজের কাছে কোনো কথা থাকে না গোপন।
দিনের দুফুর বেলা যেই তুমি আসছিলা ঘরে
আতখা এমন মনে হইছিল- আন্ধার যেমন,
আতখা এমন ছায়া সোহাগের আর্শির ভিতরে।
আবার ডাকলে পরে কিছুতেই স্বীকার হমু না।
বুকের পাষাণ নিয়া দিমু ডুব শীতল যমুনা।।


নদীর কিনারে গিয়া দেখি নাও নিয়া গ্যাছে কেউ
অথচ এই তো বান্ধা আছিল সে বিকাল বেলায়।
আমার অস্থির করে বুঝি না কে এমন খেলায়,
আমার বেবাক নিয়া শান্তি নাই, পাচে পাছে ফেউ।
পানির ভিতরে য্যান ঘুন্নি দিয়া খিলখিল হাসে
যত চোর যুবতীরা, গ্যারামের শ্যাষ সীমানায়
বটের বৈরাগী চুল, ম্যাঘে চিল হারায় বারায়,
বুকের ভিতরে শিস দিয়া সন্ধা হাঁটে আশেপাশে।
এখন কোথায় যাই, এইখানে বড় সুনসান,
মানুষের দুঃখ আছে, জগতের আছে কিনা জানি না-
জগৎ এমনভাবে হয়া যায় হঠাৎ অচিনা।
মনে হয় আমার থিকাও একা বৃক্ষের পরান,
আমার থিকাও দুঃখী যমুনার নদীর কিনার।
আমার তো গ্যাছে এক, কত কোটি লক্ষ গ্যাছে তার।।


আমারে তলব দিও দ্যাখো যদি দুঃখের কাফন
তোমারে পিন্ধায়া কেউ অন্যখানে যাইবার চায়
মানুষ কি জানে ক্যান মোচড়ায় মানুষের মন,
অহেতুক দুঃখ দিয়া কেউ ক্যান এত সুখ পায়?
নদীরে জীবন কই, সেই নদী জল্লাদের মতো
ক্যান শস্য বাড়িঘর জননীর শিশুরে ডুবায়?
যে তারে পরান কই, সেই ব্যাক্তি পাইকের মতো
আমার উঠানে ক্যান নিলামের ঢোলে বাড়ি দ্যায়?
যে পারে উত্তর দিতে তার খোঁজে দিছি এ জীবন,
দ্যাখা তার পাই নাই, জানা নাই কি এর উত্তর।
জানে কেউ? যে তুমি আমার সুখ, তুমিই কি পারো
আমারে না দুঃখ দিয়া? একবার দেখি না কেমন?
কেমন না যায়া তুমি পারো দেখি অপরের ঘর?-
অপর সন্ধান করে চিরকাল অন্য ঘর কারো।।


একবার চাই এক চিক্কুর দিবার, দিমু তয়?
জিগাই কিসের সুখে দুঃখ নিয়া তুমি কর ঘর?
আঙিনার পাড়ে ফুলগাছ দিলে কি সোন্দর হয়,
দুঃখের কুসুম ঘিরা থাকে যার, জীয়ন্তে কবর।
পাথারে বৃক্ষের তরে ঘন ছায়া জুড়ায় পরান,
গাঙের ভিতরে মাছ সারাদিন সাঁতরায় সুখে,
বাসরের পরে ছায়া য্যান দেহে গোক্ষুর জড়ান,
উদাস সংসারে ব্যথা সারাদিন ঘাই দেয় বুকে।
তবুও সংসার নিয়া তারে নিয়া তুমি কি পাগল,
তোলো লালশাক মাঠে, ফসফস কোটো পুঁটিমাছ,
সাধের ব্যাঞ্জন করো, রান্ধো ক্ষীর পুড়ায়া আঞ্চল,
বিকাল বেলায় কর কুঙ্কুমের ফোঁটা দিয়া সাজ।
ইচ্ছা করে টান দিয়া নিয়া যাই তোমারে রান্ধুনি,
তোমার সুতায় আমি একখান নীল শাড়ি বুনি।।

১০
কে য্যান কানতে আছে- তার শব্দ পাওয়া যায় কানে,
নদীও শুকায়া যায়, আকালের বাতাস ফোঁপায়,
মানুষেরা বাড়িঘর বানায় না আর এই খানে,
গোক্ষুর লতায়া ওঠে যুবতীর চুলের খোঁপায়।
বুকের ভিতর থিকা লাফ দিয়া ওঠে যে চিক্কুর,
আমি তার সাথে দেই শিমুলের ফুলের তুলনা,
নিথর দুফুর বেলা, মরা পাখি, রবি কি নিষ্ঠুর,
আগুন লাগায়া দিবে, হবে খাক, তারি এ সূচনা।
অথচ আমারে কও একদিন এরও শ্যাষ আছে-
আষাঢ়ের পুন্নিমার আশা আর এ দ্যাশে করি না,
চক্ষু যে খাবলা দিয়া খায় সেই পাখি বসা গাছে,
অথচ খাড়ায়া থাকি, এক পাও কোথাও নড়ি না।
সকল কলস আমি কালঘাটে শূণ্য দেইখাছি,
তারে না দেইখাছি তাই দ্যাখনের চক্ষু দিতে রাজি।।

১১
কি আছে তোমার দ্যাশে? নদী আছে? আছে নাকি ঘর?
ঘরের ভিতরে আছে পরানের নিকটে যে থাকে?
উত্তর সিথানে গাছ, সেই গাছে পাখির কোটর
আছে নাকি? পাখিরা কি মানুষের গলা নিয়া ডাকে?
যখন তোমার দ্যাখা জানা নাই পাবো কি পাবো না,
যখন গাছের তলে এই দেহ দিবে কালঘুম,
যখন ফুরায়া যাবে জীবনে নীল শাড়ি বোনা,
তখন কি তারা সব কয়া দিবে আগাম-নিগুম?
আমার তো দ্যাশ নাই, নদী নাই, ঘর নাই, লোক,
আমার বিছানে নাই সোহাগের তাঁতের চাদর,
আমার বেড়ায় খালি ইন্দুরের বড় বর ফোক,
আমার বেবাক ফুল কাফনের ইরানি আতর।
তোমার কি সাধ্য আছে নিয়া যাও এইখান থিকা,
আমার জীবন নিয়া করো তুমি সাতনরী ছিকা?

১২
উঠানের সেই দিকে আন্ধারের ইয়া লম্বা লাশ,
শিমের মাচার নিচে জোছনার সাপের ছলম,
পরীরা সন্ধান করে যুবতীর ফুলের কলম,
তারার ভিতরে এক ধুনকার ধুনায় কাপাশ,
আকাশে দোলায় কার বিবাহের রুপার বাসন,
গাবের বাবরি চুল আলখেল্লা পরা বয়াতির,
গাভির ওলান দিয়া ক্ষীণ ধারে পড়তাছে ক্ষীর,
দুই গাঙ্গ এক হয়া যাইতাছে- কান্দন, হাসন।
একবার আসবা না?- তোমারেও ডাক দিতে আছে
যে তুমি দুঃখের দিকে একা একা যোজন গিয়াছো?
একবার দেখবা না তোমারেও ডাক দিতে আছে
যে তুমি আঘাত নিয়া সারাদিন কি তফাত আছো?
যে নাই সে নাই সই, তাই সই, যা আছে তা আছে,
এমন পুন্নিমা আইজ, কোন দুঃখে দুয়ার দিয়াছো?

১৩
তোমার বিয়ার দিন মনে হইল, সত্য নিও মনে,
এত বড় এত গোল কোনোদিন দেখি নাই চান।
তুলার মতন ফুল, রাণী য্যান দরবারে বসা,
নদীর গহীন তলে জোছনায় দিয়া সে প্রাসাদ।
পাথারে নিরালা গাছ আলগোছে একখানা হাত
আমার আন্ধার পিঠে দিয়া কয়, ‘তোমারে সহসা
দেখাই কিভবে সব মানুষের নিজের বানান,
পরীর সাক্ষাৎ নাই গেরস্তের বাড়ির পিছনে।’
দিঘল নায়ের মতো দুঃখ এক নদী দিয়া যায়-
মাঝি নাই, ছই নাই, নাই কোনো কেরায়া কি লোক।
না হয় অনেকে কয়- এক গেলে অন্য আর আসে,
অন্যের মধ্যে কি সেই পরানের এক পাওয়া যায়?-
তাই না সচ্ছল দ্যাশ অথচ কি বিরান সড়ক।
মানুষ বোঝে না বইলা পুন্নিমার চান এত হাসে।।

১৪
কি কামে মানুষ দ্যাখে মানুষের বুকের ভিতরে
নীল এক আসমান- তার তলে যমুনার ঢল,
যখন সে দেখে তার পরানের গহীন শিকড়ে
এমন কঠিন টান আচানক পড়ে সে চঞ্চল?
কিসের সন্ধান করে মানুষের ভিতরে মানুষ?
এমন কি কথা আছে কারো কাছে না কইলে নাই?
সুখের সকল দানা কি কামে যে হইয়া যায় তুষ?
জানি নাই, বুঝি নাই, যমুনারও বুঝি তল নাই।
তয় কি বৃক্ষের কাছে যামু আমি? তাই যাই তয়?
বনের পশুর কাছে জোড়া জোড়া আছে যে গহীনে?
যা পারে জবাব দিতে, গিয়া দেখি শূণ্য তার পাড়া,
একবার নিয়া আসে আকালের কঠিন সময়,
আবার ভাসায় ঢলে খ্যাতমাঠ শুকনার দিনে,
আমার আন্ধার নিয়া দেয় না সে একটাও তারা।

১৫
আমারে সোন্দর তুমি কও নাই কোনো একদিন,
আমার হাতের পিঠা কও নাই কি রকম মিঠা,
সেই তুমি তোমারেই দিছি আমি যুবতীর চিন-
চোখ-কানা দেখ নাই বিছানায় আছে লাল-ছিটা?
তয় কি তোমারে আমি ফাঁকি দিয়া পিছন বাড়িতে
যামু তার কাছে কও আমারে যে দিতে যায় পান?
অথবা জিগার ডালে ফাঁসি নিয়া নিজের শাড়িতে
ভূত হয়া তোমার গামছায় দিমু আন্ধারে টান?
তখন আমারে তুমি দেখি হেলা করো কি রকম,
শরীল পাথর হয়া যায় কি না পানের ছোবলে,
আমারে হারায়া দেখি জমিহারা চাষী হও কি না?
এমন দেখতে বড় সাধ হয় আল্লার কসম,
দেখার বাসনা করে কালপোকা তোমার ফসলে,
অথচ ঘরেই থাকি, পোড়া ঘরে থাকতে পারি না।।

১৬
যমুনার পারে আসলে তার কথা খালি মনে হয়,
এমন পরান পড়ে- সব কিছু বিকাল-বিকাল,
লোকের চেহারা দেখি, হাত নাড়ে, নাড়ে তারা পাও,
কথা কয়, তাও বোঝা যায় না যে কি কয় কি কয়।
চক্ষের ভিতরে নাচে হাটবারে বাঁওহাতি খাল,
নায়ের উপরে দাগ- একদিন রাখছিল পাও।
জলে ভেঁজা, কত বর্ষা গ্রীষ্মকাল গ্যাছে তারপর,
কতবার নাও নিয়া পাড়ি দিছি এ কুল ও কুল,
তাও সেই পাড় আমি চিনি নাই, দেখি নাই গাঙ্গে।
বুকের ভিতরে ঢেলা সারাদিন কিষানেরা ভাঙ্গে,
রাখাল নষ্টামি করে, পড়ে লাল শিমুলের ফুল,
জলের ভিতরে নড়ে মনে বান্ধা আছিল যে ঘরে।
কইছিল সে আমারে- সেই পাড়ে নিবা না আমারে?
কোন পাড়? ইচ্ছা তার আছিল সে যায় কোন পাড়ে?

১৭
এমন অদ্ভুতভাবে কথা কয়া ওঠে কে, আন্ধারে?-
য্যান এক উত্তরের ধলাহাঁস দক্ষিণের টানে
যাইতে যাইতে শ্যাষে শুকনা এক নদীর কিনারে
ডাক দিয়া ওঠে, ‘আগো, চেনা কেউ আছো কোনোখানে?’
আমি তো নিরালা মনে আছিলাম আমার সংসারে,
তার সেই ডাক, সেই কান্দনের আওয়াজটা কানে
যাইতেই দেখি য্যান একা আমি চৈতের পাথারে-
আমারে আমার সব নিদারুণ তীর হয়া হানে।
আমি তা্রে কি দিব উত্তর? তারে কোন কথা কই?
সে ক্যান আমারে ডাক দিয়া গেল, বুঝিনা ইয়াও।
আমি কি করবার পারি? কতটুকু ক্ষমতা আমার?
উপস্থিত মনে হয়, তারে আমি ডাক দিয়া লই,
ঝাপাইয়া ছিনতাই করি যমুনার ছিপছিপা নাও,
সকল ফালায়া দিয়া নিরুদ্দেশ সাথে যাই তার।।

১৮
এ কেমন শব্দ, এ কেমন কথার আদব?
কাতারে কাতার খাড়া, আমি তার ভেদ বুঝি নাই।
নিজের চিন্তার পাখি উড়ায়া যে দিমু কি তাজ্জব,
খানিক হুকুম মানে, তারপর বেবাক নাজাই।
শব্দের ভিতর থিকা মনে হয় শুনি কার স্বর,
একজন, দুইজন, দশজন, হাজার হাজার-
আমার মতন যারা ছিল এই মাটির উপর,
এখন কবরে গ্যাছে, করি আমি তাদেরই বাজার।
এরেই বন্ধন কয়? এর থিকা মুক্তি কারো নাই।
যখনি তোমার ভাষা আমি কই, তুমি ওঠো কয়া,
আমার মূর্তির মুখ আলগোছে বদলায়া দ্যাও।
যদিবা চেতনা পায়া কিছু করি হাতে লাগে ছ্যাও।
আসলে তোমার মতো এতখানি কেউ না নিদয়া,
যার দ্যাশ তার দ্যাশে চলে তার নিজের টাকাই।।

১৯
পথের উপরে এক বাজপড়া তালগাছ খাড়া,
পিছের জঙ্গল থিকা কুড়ালের শব্দ শোনা যায়,
যমুনার জলে দ্যাখে নাও তার নিজের চেহারা,
বাতাসের কোলে মাথা কুশালের ফসল ঘুমায়,
ধুলায় চক্কর দিয়া খেলা করে বিরান পাথার,
তুলার অনেকগুলা ফুল আটকা জিগার আঠায়,
দমের ভিতরে থামা বুকরঙ্গি মাছের কাতার,
আতখা বেবাক য্যান গিয়া পড়ছে অচিনঘাটায়।
আমিও সেবার এক সুনসানে গিয়া পড়ছিলাম-
য্যান সব টান দিয়া নিয়া গ্যাছে সে কার বারুন,
যেইদিকে চাই দেখি ভয়ানক নিঝুম নিথর,
নিয়া গ্যাছে নাম ধাম আর ইচ্ছার নায়ের বাদাম,
অঙ্গের কুসুম নিয়া খেলা করছে দুফর দারুণ,
যেদিন ফালায়া গেল আমারে সে আমার ভিতর।।

২০
কি কামে দুফর বেলা পাতাগুলা উড়ায় বাতাস?
আবার সে কার স্বর মাঠাপাড়ে ফোঁপায় এমন?
কি কামে আমার চক্ষে পড়ে খালি মানুষের লাশ?
যা দ্যাখার দেইখাছি, বাকি আছে আর কি দ্যাখন?
সময় দেখায়া গ্যাছে বাল্যকালে আমের সুঘ্রাণে?
যৈবন অন্যের হাতে য্যান এক কাচের বাসন,
দুঃখের পাখিরে আমি দেইখাছি বিয়ার বিহানে,
কিভাবে কালির লেখা হয়া যায় জলের লিখন।
আমারে ছাড়ান দিয়া যায় না সে যেখানেই যাই,
দ্যাশ কি বিদ্যাশ কও, চিনা কিংবা অচিনাই হও,
দুঃখের বাদাম তোলা সেই এক নাও সব গাঙ্গে।
পালায়া নিস্তার কই? সবখানে সেই না শানাই।
যেইখানেই যাই গিয়া, খাড়া দেখি সেই শও শও
পুয়ারন মিস্তিরি- তারা মনোযোগ দিয়া সব ভাঙ্গে।।

২১
হাজার দক্ষিণ দিকে যাও তুমি গাঙ্গের মোহানা
পাও যদি কইও আমারে। আমি না অনেক দিন
আমার যৈবন আমি মোহানার খোঁজে না দিলাম,
তাও তারে দেখি নাই, শুনি আছে ধলা গাঙচিল,
মাছের পাহারা ঘেরা খিজিরের অতল আস্তানা,
আছে তার ইশারায় আগুনের দেহ এক জ্বীন-
যদি ইচ্ছা করে তার অসম্ভব নাই কোন কাম,
যারে না পাইতে পারি তারো সাথে দিতে পারে মিল।
তুমি যে মনের মতো ঘরে আছো এই কথা কও-
সেই ভাগ্য মনে হয় খিজিরের বিশেষ অছিলা।
আমার হিসাবে কয়- মানুষের সাধ্য নাই পায়।
যতই সাধনা কর, পরানের যত কাছে রও
সে জন দুরেই থাকে, তুমি থাকো যেখানে আছিলা।
আমার জানতে সাধ, মোহানায় গ্যাছে কোন নায়।।

২২
এক্কেরে আওয়াজ নাই, নদী খালি চাপড় দিতাছে
গেরামের পিঠে আর ফিসফাস কইতাছে, ‘ঘুম,
ঘুমারে এখনতরি সাতভাই পূর্বদিকে আছে।‘
এক ফোঁটা ঘুম যে আসে না তার আমি কি করুম?
অখনো খেজুরগাছে টুপটুপ রস পড়তে আছে,
এত যে কান্দন আছে- তয় চক্ষু ভেজে না কেমন?
ঘাটের যুগল নাও য্যান ঠোঁটে ঠোঁট দিয়া আছে,
আমার দক্ষিণ পাশে সরে নাই চান্দের গেরন।
আধান শীতলপাটি ভরা এক আমাবস্যা নিয়া
দেখি রোজ উত্তরের একদল ধলাহাঁস নামে,
বুকের ভিতরে চুপ, তারপর আতখা উড়াল-
এ দ্যাশে মানুষ নাই, অন্যখানে তাই যায় গিয়া।
এখানে কিসের বাড়ি? এত দ্রব্য আসে কোন কামে?
কেউ না দেখুক, তারা দেইখাছে দুঃখের কুড়াল।।

২৩
আমারে যেদিন তুমি ডাক দিলা তোমার ভাষায়
মনে হইল এ কোন পাখির দ্যাশে গিয়া পড়লাম,
এ কোন নদীর বুকে এতগুলা নায়ের বাদাম,
এত যে অচিন বৃক্ষ এতদিন আছিল কোথায়?
আমার সর্বাঙ্গে দেখি পাখিদের রাতির পালক,
নায়ের ভিতর থিকা ডাক দ্যায় আমারে ভুবন,
আমার শরীলে য্যান শুরু হয় বৃক্ষের রোপণ,
আসলে ভাষাই হইল একমাত্র ভাবের পালক।
তাই আমি অন্যখানে বহুদিন ছিলাম যদিও,
যেদিন আমারে তুমি ডাক দিলা নিরালা দুফর,
চক্ষের পলকে গেল পালটায়া পুরানা সে ঘর,
তার সাথে এতকাল আছিল যে ভাবের সাথীও।
এখন আমার ঠোঁটে শুনি আমি অন্য এক স্বর,
ভাষাই আপন করে আর সেই ভাষা করে পর।।

২৪
আবার তোমার কোলে ফিরা যায় তোমার সন্তান,
আবার তোমার কোলে, খালি কোল, উথলায়া পড়ে
দুধের ঘেরানে ভরা, জননী গো, পুন্নিমার চান-
আবার সে ঘরে ফিরা আইসাছে সারাদিন পরে।
আবার সে আইসাছে করালের ঘুম চক্ষে নিয়া,
চক্ষের ভিতরে তার গেরেপ্তার বিহানের সোনা,
তবনের নীল খোপে শিমুলের লাল রঙ নিয়া,
আবার সে আইসাছে, জননী গো, তুমি কাইন্দো না।
তোমার সন্তান গ্যাছে জননী গো, সে আমার না ভাই,
আমার দেহের থিকা একখানা কাটা গ্যাছে হাত,
উঠানে খাড়ায়া আছি, খুলবা না তোমার দুয়ার?
আমার মতন যারা হারায়াছে আইজ তার ভাই,
য্যান শিলাবিষ্টি শ্যাষে পরিস্কার আকাশ হঠাৎ ,
হাজার হাজার তারা ঘিরা আছে পুন্নিমা তোমার।।

২৫
কত না দুধের ক্ষীর খায়া গ্যাছে কালের গোপাল,
কতবার কত রোয়া কারবালা খ্যাতের খরায়,
কন না রঙিলা নাও নিয়া গ্যাছে কাল যমুনায়,
অঘোরে হারায়া গাভি ফেরে নাই নিজস্ব রাখাল।
কত না পুকুর দিতে পারে নাই পানি গ্রীষ্মকালে,
বাসকের ছাল কত ভালো করতে পারে নাই রোগ,
দেহের কত না রক্ত খায়া গ্যাছে কত ছিনাজোঁক,
কুসুম উধাও হয়া গ্যাছে কত শিমুলের ডালে।
তাই কি ছাড়ান দিমু বিহানের ধবল দোহান?
কামারের কাছে বান্ধা দিমু এই রূপার লাঙ্গল?
আমার বৃক্ষেরে তাই দিতে কমু জহরের ফল?
বাদ দিয়া দিমু কও পরানের গহীন কথন?
আমার তিস্তারে দেখি, সেও পোষ মানে না ভাটিতে,
কি তার উথাল নাচ গেরস্তের সমান মাটিতে!

২৬
ক্যান তুই গিয়াছিলি?- আমি তরে জিগামু অখন
চান্দের ভিতর ফের, যেইখানে জটিলতা বাড়ে,
অশথ জড়ায়া থাকে নদী নিয়া জলের কিনারে,
আমার গেরাম ঘিরা যেইখানে খালি পলায়ন-
মানুষের, মানুষের, আর তর চক্ষের কাজল,
যেইখানে মেলা দেয় একখান সুনসান নাও,
যে নায়ে সোয়ার নাই, ‘কেডা যাও, কেডা বায়া যাও?’
বেকল আছাড় দিয়া ওঠে কালা যমুনার জল?
কেউ নাই, কেউ তর নাই, তুই নিজেই জানস,
তবু ক্যান গিয়াছিলি? ক্যান তুই দিয়াছিলি ফাল?
কিসের কি বাদ্যে তর রক্ত করে উথাল পাথাল
আমারে ক’ দেখি তুই? ক’না দেখি, কি চিল মানস?
ল’যাই জলের ধারে দ্যাখ ছায়া আমার কি তর?
মানুষে মানুষে নাই কোনো ভেদ দুঃখের ভিতর।।

২৭
আউসের খ্যাতে মাঠে যুবতীরা দিতাছে সাঁতার,
দ্যাখো না কেমন তারা চিতলের মতো খেলা করে,
কি তারা তালাশ করে দিনমান নাগর ভাতার-
যারা ডুব দিয়া আছে এই ধান বানের সাগরে;
বিছনের মতো পড়ে তারাবাজি চুমার চুমার,
কি ঘাই আতখা মারে খলবল এই হাসে তারা
একজন দুইজন সাতজন নাকি বেশুমার
বুকের ভিতরে ভাঙ্গে নিশীথের শরমের পাড়া।
আমি যেই সেইখানে আচানক গিয়া পড়লাম
চক্ষের নিমেষে তারা নাই আর কোনোখানে নাই,
আমি যেই সেইখানে তোমারেনি খোঁজ করলাম-
কিছু না দেইখা নিজে বেয়াকুফ বড় শরমাই।
এই ছিল এই নাই, কই গেল, কই যার তারা?
বেমালুম কই তুমি যাও গিয়া খা’বের ইশারা?

২৮
ঝকঝক ঝকঝক সারাদিন করে আয়নাটা-
বুকে নাই ছবি নাই পড়ে নাই একখানা ছবি,
বেবাক একাকী য্যান সুনসান ইস্কুরুপে আঁটা,
যা চাই তা নাই তয় চমৎকার আছে আর সবি।
আছে সবি আছে এক মইষের শিঙ্গের চিরুনি,
রুমাল, চুলের ফিতা জবজবা এখনোনি ত্যালে।
বিবাহের বাসরে শ্যাষ য্যান গেছে সে ফিরুনি-
ফেরার আশাও নাই, ফেরা নাই একবার গ্যালে।
গেছে তো আমারে যদি বেরহম নিয়া যায় সাথে,
আমি তো এমন ঘরে বাস করি আশা করি নাই;
য্যান হাত দিয়া আছি ইন্দুরের বিষআলা ভাতে,
তবু তো ধরে না বিষ মুখে তুলি যত লোকমাই।
নিজেরও পড়ে না ছবিকাটা সেই আয়নায়,
সে নাই চেহারা নাই, খালি বড় খালি তড়পায়।।

২৯
তোমারে যে ভালোবাসে এর থিকা আরো পাঁচগুন
আল্লার কসম আমি দিমু তারে এই জামাখান,
আমার কলম আমি দিমু তারে, শরীলের খুন
দোয়াত ভরায়া দিমু, অনুরোধ খালি একখান-
সে য্যান আমার থিকা আরো ভালো পদ্য লেখে আর
যাদুমন্ত্রে রূপার শিকল হাতে দিতে পারে তার।
তোমারে যে ভালোবাসে এর থিকা আরো দশগুন
আল্লার কসম আমি দিমু তারে এই বাড়িখান,
আমার উঠান আমি দিমু তারে, শীতের আগুন-
নিজেই সাজায়া দিমু, অনুরোধ খালি একখান-
সে য্যান আমার থিকা আরো ভালো নিদ্রা যায় আর
তারেই নিকটে পায় কথা যার নিকটে থাকার।
নচেৎ নষ্টামি জানি, যদি পাছ না ছাড়ে আমার,
গাঙ্গেতে চুবান দিয়া তারে আমি শুকাবো আবার।।

৩০
আরে ও ইসের বেটি, চুলে দিয়া শিমুলের ফুল
যাস কই, কই যাস? যুবকের মাঝখান দিয়া?
মানুষ গাঙ্গের মতো, বানে ভাসে তারো দুই কুল-
সে পানি কাতান বড়, খলবল রঙ তার সিয়া।
আরে থাম, কই যাস? তবু যায় ঘুরনান দিয়া?
শিমুল যতই লাল সেই লাল তবু কিছু কম
যত লাল যেইখানে দেহ তর লুকায় শরম।
খাড়া না করুক দেখি একবার কেউ তরে বিয়া।
বেবাক পানির টান সেইকালে নরোম সোঁতায়,
তখন পরীর রানী সেও কিনা অতি বাধ্য বশ,
তখন দেখিনা তুই আইলের বেড়া নি ভাঙ্গস,
তখন শরম দেখি থাকে তর কেমন কোথায়?
নষ্ট তর পায়ে পায়ে স্বন্নলতা আনন্তের মূল,
দিবিনে তখন তুই সিঙ্গারের আসল মাশুল।।

৩১
কে করে পরশ তার জীবনের এত জটিলতা?
তোমার অধিক টান দেয় বৃক্ষ দেয় বিষলতা;
একবার আমারে আছাড় দিয়া সোজা করে ফের,
আমারই মতন যারা বেশুমার সন্তান মায়ের।
কিসে যে চালনা করে এই দেহ এই ভবিষ্যৎ-
কিছুই বুঝি না, দেখি আচানক শেষ হয় পথ;
যে পথেই মেলা দেই সেই পথে ভয়ানক ভুত-
এ বড় কঠিন জাগা, বসবাস বড়ই অদ্ভুত।
তয় কি ছাড়ান দিমু হাতে ধরা শেষ রশিখান?
তয় কি পাথারে দিমু হাতে ধরা বেঘোরে পরান?
নাকি তুমি একবার হাত দিয়া ডাক দিবা কাছে
আমারেও আমার মতন যারা একা একা আছে,
সকলেরে একজোট কইরা নি তুলবা আবার?
তোমার নিকটে রাখি নিদানের এই দরবার।।

৩২
নিঝুম জঙ্গল দিয়া যাইতেই ধনেশের ডাক।
যেমন আতখা ভাঙ্গে কাঠুরার বুকের কাছাড়
চক্ষের পলকে তুমি দেখা দিয়া করো মেছমার;
রতির আগুনে সব দাউদাউ, পরিণামে খাক
আমার এ দেহ বটে, ভবিষ্যৎ পায় না নিস্তার;
সকল কিছুর পরে দ্যাও তুমি উড়ায়া বাদাম,
তীরের মতন তারা ধায়া যায় কও কোন ধাম?
বরং তোমার থিকা দয়াবতী জোয়ার নিস্তার।
তবুও আবার আমি ধনেশের মতো দিয়া ডাক
আবার পাথার বন পথ ঘাট বাজার সংসার
তালাশ করুম আর গাভীনের করুম সন্ধান,
আবার দেখুম আমি ছাই-পোকা মাজরার ঝাঁক
কিভাবে আমার খ্যাত করে সব শস্য ছারখার,
আবারো বুনুম আমি এই খ্যাতে কাউনের ধান।।

৩৩

এমন বৃক্ষ কি নাই ডালে যার নাই কোন পরী,
এমন নদী কি নাই জলে যার পড়ে না চেহারা,
এমন যাত্রা কি নাই যাতে নাই পবনের তরী,
এমন ডুলি কি নাই যাতে নাই নিষেধের ঘেরা,
এমন নারী কি নাই বুকে যার নাই ভালোবাসা,
এমন পত্র কি নাই বাক্যে যার নাই নিরাময়,
এমন শস্য কি নাই যার বীজ বোনে নাই চাষা,
এমন মৃত্যু কি নাই যাতে নাই খোয়াবের লয়?
এমন কি রূপ আছে রূপ যার গড়ে না কুমার,
এমন কি দেখা আছে দেখা যার চোখে না কুলায়,
এমন কি কথা আছে কথা যার থাকে না ধুলায়,
এমন কি নেশা আছে নেশা যার অধিক চুমার?
পরানে পরান যদি এই মতো হাজার সোয়াল
সারাদিন যমুনায় খলবল বিতল বোয়াল।।

নূরলদীনের সারাজীবন – সৈয়দ শামসুল হক

নিলক্ষা আকাশ নীল, হাজার হাজার তারা ঐ নীলে অগণিত আর
নিচে গ্রাম, গঞ্জ, হাট, জনপদ, লোকালয় আছে ঊনসত্তর হাজার।
ধবলদুধের মতো জ্যোৎস্না তার ঢালিতেছে চাঁদ – পূর্ণিমার।
নষ্ট খেত, নষ্ট মাঠ, নদী নষ্ট, বীজ নষ্ট, বড় নষ্ট যখন সংসার
তখন হঠাৎ কেন দেখা দেয় নিলক্ষার নীলে তীব্র শিস
দিয়ে এত বড় চাঁদ?
অতি অকস্মাৎ
স্তব্ধতার দেহ ছিঁড়ে কোন ধ্বনি? কোন শব্দ? কিসের প্রপাত?
গোল হয়ে আসুন সকলে,
ঘন হয়ে আসুন সকলে,
আমার মিনতি আজ স্থির হয়ে বসুন সকলে।
অতীত হঠাৎ হাতে হানা দেয় মরা আঙিনায়।
নূরলদীনের বাড়ি রংপুরে যে ছিল,
রংপুরে নূরলদীন একদিন ডাক দিয়েছিল
১১৮৯ সনে।
আবার বাংলার বুঝি পড়ে যায় মনে,
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন শকুন নেমে আসে এই সোনার বাংলায়;
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমার দেশ ছেয়ে যায় দালালেরই আলখাল্লায়;
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমার স্বপ্ন লুট হয়ে যায়;
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমার কণ্ঠ বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায়;
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমারই দেশে এ আমার দেহ থেকে রক্ত ঝরে যায়
ইতিহাসে, প্রতিটি পৃষ্ঠায়।
আসুন, আসুন তবে, আজ এই প্রশস্ত প্রান্তরে;
যখন স্মৃতির দুধ জ্যোৎস্নার সাথে ঝরে পড়ে,
তখন কে থাকে ঘুমে?কে থাকে ভেতরে?
কে একা নিঃসঙ্গ বসে অশ্রুপাত করে?
সমস্ত নদীর অশ্রু অবশেষে ব্রহ্মপূত্রে মেশে।
নূরলদীনের কথা যেন সারা দেশে
পাহাড়ী ঢলের মতো নেমে এসে সমস্ত ভাসায়,
অভাগা মানুষ যেন জেগে ওঠে আবার এ আশায়
যে, আবার নূরলদীন একদিন আসিবে বাংলায়,
আবার নূরলদীন একদিন কাল পূর্ণিমায়
দিবে ডাক,জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়?

অবশেষের প্রতীক্ষায় | এনামুল খাঁন

ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি বইছে বাতাস, অভিমানী আকাশ তুমি অভিমানী আকাশ।

কানে কানে কতো কথা বলে যায় রয়ে যায় মনে সবই ক্ষয়ে যায় কাল।

এই অ-কালে প্রেমাতালে হয়েছি মাতাল তোমাতেই বৃত্ত বর্গ একেছি স-কাল।

দেখেছি চৈতালি সাজিয়েছি ফাল্গুনী রক্ত করবী হাতে দাড়িয়ে আছো বৈকালে।

বিন্ধু বিসার্গ ভাবিনী তো ক্ষিয়ী কাল মন্ত্র মগ্ধ হয়ে দেখেছি শুধু ঐ স-কাল।