সম্পার্কানুকাব্য

আমাদের একটা সহজাত স্বভাব আছে। একবার যদি কোন কিছু বলে বসি তো সেটা করবোই ধরণের স্বভাব। কিন্তু আদতে তা আমরা কোন দিনই করে উঠে পারিনা। পারা সম্ভবও হয় না।

ধরা যাক, কেউ একজন চিন্তা করলো অনেক দিন পড়ে বসি করে করেও পড়তে বসা হচ্ছে না। তো, আগামীকাল থেকে পড়া শুরু করবে। তার জীবনে আর ওই আগামীকাল আর আসবে না। কোনভাবেই আসবে না। হয়তো দেখা যাবে, ভীষণ ব্যাস্ত করে ফেলবে নিজেকে। পড়তে বসার কথা আর মনেই থাকবে না। [নিজের থেকে অনুমিত]

কিন্তু একটা ব্যাপারে আমরা কখনই ছাড় দেই না। পৃথিবী উল্টে গেলোও আমরা আমাদের কমিটমেন্ট ভাঙ্গি না। সম্পর্কে আবধতায় আমরা হিসেব গুলা কিভাবে করি তা বুঝতে পারি না। আসলে এখানে কোন নিয়ম নেই হয়তোবা। আমরা বাজি ধরে প্রেম করি। বাজি ধরে ডেট করি। বাজি ধরে বিয়ে করি। কিংবা, বাজি ধরে প্রেমিকাকে চুমু দেই সবার সামনে।

আমরা অনেক কিছুই করি এই সম্পর্কের মধ্যে। প্রেম হয় প্রেম ভাঙ্গে। আবার, প্রেম হয় প্রেম ভাঙ্গে। অনেক থেকে অনেক গুলা প্রেম আমাদের হয়।

কিন্তু কোন আধামিয় সম্পর্কে আবধ কোন মানুষের যদি বলে বসে আপনার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। বা আপনার সাথে আমার কোন কথা নেই। কিংবা, আমি আপনার সাথে কোন দিন কথা বলবো না বা তুমি আমার সাথে কোনদিন কথা বলবে না। তখন এই আধামিয়তার কোন রূপরেখা করা যায় না। হয়তোবা তখন মনে হয় চাঁদ কিংবা তারা’কে সাক্ষী রাখলেও পারতাম।

গভীর সম্পর্ক গুলাতে অনেক ভাঙ্গা গড়া হয় কিন্তু এই আধামিয় সম্পর্ক গুলাতে খুব বেশি মাত্রাই জটিলরূপ ধারন করে। না এখানে কোন ধরে রাখার কারণ থাকে, না ছেড়ে দেওয়ার কারণ থাকে। এই সম্পর্ক গুলা হয়তো কোন দিনই পূর্ণতা পাবে না। বলা ভালো পূর্ণতা পাওয়ার কোন দরকারও নেই। কিন্তু সম্পর্ক গুলা যদি কোন ভাবে একবার মিসকন্ডাক্ট হয় কোন ভাবেই আর তারল্যতা ধরে রাখতে পারে না।

যাদের বহির্জগৎ সীমিত তাদের এই নামহীন সম্পর্ক থাকে অনেক বেশি। আর সেই মানুষের গুলা হয়তো প্রতিনয়তই একটা গভীর ভয়ে’র মধ্যে দিনাতিপাত করে। এই ভুঝি কোন অদৃশ্য ভালোবাসা ভেঙ্গে পড়বে তার ছোট্ট আলসেমির জগতে।

ধারাবাহিক সমস্যারঃ যা লিখতে চাইছি সেটার ধারে কাছেও যেতে পারছি না।

একটি অপরিশোধিত জন্মদিন

সম্পর্ক গুলা কেমন জানি। দুর্গন্ধ অথবা সুগন্ধ। যেভাবেই থাক’না কেন ঠিকই ছড়িয়ে পড়বে।

দিন খন ঠিক মনে পড়ে না। ২০১০ সালের পরে পারিবারিক ভাবে ভূগোলিক পরিবর্তন হয় আমাদের। অর্থাৎ, বাড়ির অবস্থান পরিবর্তন। এর পরে থেকেই একরকম একা একাই থাকি। খুব বেশি কারোর সাথে চলাফেলা করা হয় না। একা থাকার জন্যই হোক আর যে কারনেই হয় মানসিক একটা পরিবর্তন আমার হয়। অনেকটা “ইন্ট্রর্ভাট” ধরণের। একটা সময় পরে আমি খেয়াল করলাম আমার ফিজিক্যালি কথা বলার বা দেখা করার মতো মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন। সবার সাথে হয়তো প্রতিনিয়ত দেখা হয়না। এই জিনিষের হাজারটা খারাপ দিকের মধ্যেও একটা ভালো জিনিষ আমি বুঝতে পারলাম। আমি একদমই মিথ্যা কথা বলি না। কারণ মানুষের সাথে তো প্রায় কথায় হয় না। তো মিথ্যা বলবো কখন আর কিভাবে(বর্তমান অবস্থার যদিও কিছুটা পরিবর্তন এসছে)।

happybirthdaygoogle

আমার একার ঘরে বই, কম্পিউটার আর আমি। বেশ বই পড়ে, সিনেমা দেখে সময় কাটে। ভালোই লাগে। না হঠাৎ বড় কোন পরিবর্তন আমার জীবনে হয়নি। যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে, এর মধ্যে কিছু নতুন মুখ, নতুন পরিচয়। মদ্দাকথা, ভালো কিছু মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। যারা সব্বাই নিজের অবস্থানে সু-দৃঢ়। সবারই নিজস্ব কিছু মতার্দশ আছে। যাদের কাছে থেকে নিজের ভুলগুলা শুধরে নেওয়া যায়। হোক সে ছোট কি বড়। জানা যায় জীবনের অদৃশ্য পরীক্ষার মোকাবেলা কিভাবে করতে হবে। যেটা কিনা পরিবার থেকেই শেখার কথা ছিল।

প্রযুক্তির প্রসার আর নিজের অজ্ঞতায় মিলে ফেচবুক, ব্লগ সহ আরো অনেক কিছুর সাথে যুক্ত(যদিও দিন খন করে করা হয়নি)। মূলত জানার জন্য যুক্ত। এই ভার্সুয়াল জগত এর সম্পর্ক গুলা কেমন কেমন মনে হতো আগে। একটা বাটনে টিপ দিলেই বন্ধুত্ব। কেমন মূল্যহীন ব্যাপার খেলনা মতো ব্যাপার। কিন্তু এখন দেখি এগুলারও বাস্তবতা আছে। এই মাধ্যম দিয়ে অনেক কিছু করা সম্ভব। উপকার-অপকার সব কিছু।

আমাদের বাস্তব জীবনের সম্পর্কে গুলা অদৃশ্য আবার এই ভার্সুয়াল জগতের সম্পর্ক গুলাও অদৃশ্য(এক অর্থে)। এক দৃষ্টিতে হয়তো দু’টাই একই বন্ধন। মহামানবেরা অনেক কিছু উপেক্ষা করতে পারে। সে ক্ষমতা তাদের থাকে। কিন্তু সাধারণ ভাবে বা বলা ভালো সাধারণ মানুষ প্রায় কোন কিছু উপেক্ষা করতে পারে না বা বলা ভালো সে ক্ষমতা সাধারণ মানুষের থাকে না । আর এই না পারার মধ্যে সব থেকে আগে যেটা থাকে সেটা হচ্ছে “সম্পর্ক”। যা কোন ভাবেই উপেক্ষা করা সম্ভব না। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় মহামানবেরাও সম্পর্কের বাঁধন গুলা উপেক্ষা করতে পারে না। পারার অভিনয় করে। আসলে মহামনবেরা মহাঅভিনেতা হয়। যা সাধারণ মানুষ পারে না। একজন সাধারণ মানুষের(গঠনের দিক দিয়ে) হিসেবে এই অসম্ভাবিও সম্পর্কের অদৃশ্য প্রবলতা, ধরে রাখার প্রচণ্ডতা কোন ভাবেই অপেক্ষা করতে পারিনা।

ফিজিক্যালি কেউ জানেই না এই দিনটি আমার জন্মদিন(যদিও জন্মদিন না)। বাই বাংলাদেশি হওয়াতে আমাদের সবারই দুইটা জন্মদিন দিন থাকে। একটা ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন। আর অন্যটা ইস্কুলে দেওয়া দিন। আমার এই জন্ম তারিখটাও ইস্কুলের দেওয়া তারিখ। যিনি দিয়েছিলেন তার নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। উনি খুবই প্রিয় শিক্ষক ছিলেন না হয়তোবা কিন্তু অন্যার ব্যক্তিত্ব(যদিও তখন ব্যক্তিত্ব কি বুঝতাম না, এখন যে খুব বুঝি তাও না) নামক একটা ব্যাপার ছিল তীব্র। ওনার নাম “রতন কুমার বাকচি।

এই মানুষটা দেওয়া দিনই আমার জন্মদিন হয়ে গেছে। এবং আমি থাকা পর্যন্ত থাকবে(আশা রাখি)। কারণ, আমি আমার ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন খন জানি না। আর জানতেও ইচ্ছে করে না কক্ষনো।

ইচ্ছে করে,
অপারগতার সাথে অভিনয় করে যায়।
দুর্বলতার সাথে অভিনয় করে যায়।
ভালোবাসার সাথে অভিনয় করে যায়।
নিজের সাথে অভিনয় করে যায়।
আয়নার সাথেও অভিনয় করে যায়।
একটা অভিনয়ের মুখোশের স্থায়ী ছাপ ফেলে যায় মুখের উপর।

ছড়িয়ে পড়া সম্পর্ক গুলা, ছড়িয়ে পড়ুক সংক্রমণের মতো।

কি লিখতে চেয়েছিলাম আর কি লিখলাম। এতোটা লিখে ফেলছি আর কেটে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে না।

মূলত লিখতে চেয়েছিলাম, ভালোবাসা উপেক্ষা করতে চাইলেও আমার, আমাদের, আমাদের কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়। বিধাতা পুরুষও ভালোবাসা উপেক্ষা করতে পারে না বা পারবে না।

জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো বা না জানানো প্রতিটি মানুষকে ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা জানায়।

ভালো মানুষেরা এমনিতেই ত্যাগী হয় তার আর তাদের ট্যাগ করছি না।

শব্দের প্রতিধ্বনি – আকছারুল ইসলাম

জীবন এখানে এলোমেলো এক শব্দ

হাওয়ায়-হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া

বৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে।

 

এই নদীতীরে গঙ্গার ভরাঘট

দেবমন্দির-‘কবর ভুমি’ শিবালয়

উপাসনার কেন্দ্রস্থল সবকিছুতেই-

এক জীবন-জীবন্ত একই জীবন।

 

এই ললনার মুখশ্রী তৃষিত হাঁসি

চন্দ্র মল্লিকার ঝরা পাপড়ি গুলো

খেয়ায় ভেসে আসা নীল দিগন্তের

পানসি মেঘের ভেলা -আর

আকাশ জুড়ে শুধু জীবন নামের

এক শব্দ, শুধু শব্দ, শুধু জীবন

শব্দ শব্দই জীবন।

 

দেহ মনে গাইবরে মাটির কানে কানে

শব্দ শুধু প্রতিধ্বনি -এক এক শব্দ-

আর শব্দই জীবন।

অকথ্য কথা

তুমি এই করছো ভালো
তোমায় চাইছি এলোমেলো।
তুমি এসো বুকের মাঝে
তোমায় রাখবো হৃদ কোমলে।
তুমি উষ্ণ বুকে সুখ শুষে থাকবে চিরকাল
তোমায় ভালোবেসে মরবো আমি অনন্তকাল।

অস্পৃশ্য কায়া

কুয়াশা ঢাকা চাদরে
দু’হাত ভরা আদরে
আলসেমি কফি কাপে
চুমু দেবো তোর ঐ ঠোঁটে।

তারাগুলো গেল ভুল পথের দিক
ঘুম হারালো আমার দু’চোখ
চাঁদ দিশেহারা তোর ঐ চোখে
সুখ খুঁজে ফিরি নখের আঁচড়ে।

হাওয়া ফিরে যাবে দিন শেষে ঘরে
আলপিনে ভুল গুলো যাবে গেঁথে
আঙ্গুল ছুয়ে দিলে ভীরু আল্পনা কায়া
ইচ্ছে তাক সাজানো থাক জল’নূপুরে।

এনামুল খান
২০১৬/০১/৩০ইং

Labour of Love

“A film is never really good unless the camera is an eye in the head of a poet.” — Orson Welles

Labour of Love
Labour of Love

এক ঘূর্ণিয়মান নিম্ন মধ্য বিত্ত দাম্পতির ভালোবাসার সংগ্রামে ঠিকে থাকার গল্প “আসা যাওয়ার মাঝে – Labour Of Love”। নিম্ন মধ্য বিত্ত জীবনের সংগ্রামরত একটি দিনের চিত্রাঙ্কিত হয় এই সিনেমাতে। দু’জনই কাজ করে বিকল্প শিফটে। দেখা হয় মাত্র এক মুহূর্তের জন্য। অঙ্কিত হয় ভালোবাসার অনুভূতি। যেখানে দৃষ্টিতেই জানা যায় অতুলন্তের কথা। প্রশ্বাসেই মিটে যায় জাগতিক চাহিদা। দু’জনেই হারিয়ে যায় এক কাপ চা’য়ে, এক দৃষ্টি আয়নাতে।

সিনেমার গল্প বলতে একটি মুহূর্তের জন্য এক দৃষ্টি তাকিয়ে থাকা। আর তাকানোতেই বোঝা যায় গভীরতা। ভালোবাসার উষ্ণতা।

সাধারণত আমরা সিনেমাতে দেখি খুব খুব ছোট ছোট দৃশ্য মিলে একটা দৃশ্য হয়। কিন্তু আমার কাছে এই সিনেমার ব্যাপারে মনে হয়ছে অন্যরকম। একটি একটি দৃশ্য মিলেই একটা সিনেমা হয়েছে। এমনটা বলছি কারণ, এই সিনেমার প্রতিটা দৃশ্য বেশ খানিকটা বড় বড়। সূর্য ডুবা থেকে অন্ধকার নেমে আসা, পায়ের ছাপ পড়া থেকে মিলিয়ে যায় পর্যন্ত একভাবে দৃশ্যটা আটকে থাকে চোখের সামনে। কোন সময় বিরক্তি আসেনি দেখতে। কারণ, পরের দৃশ্যটা যে খুবই নিপুণতার সাথে মিলিয়েই রাখা হয়েছে। পায়ের ছাপ মিলিয়ে যাওয়ার শেষ দেখা যাচ্ছে এক খণ্ড আয়নার সামনে সিঁথিতে সিঁদুর দিচ্ছে।

Labour Of Love

সিনেমাটা এক রকম নির্বাক বলা যায়। শব্দের থেকে দৃশ্যের দিকে চোখ আটকে যায় বেশী।

যারা ফাস্ট সিনেমা দেখায় অভ্যস্থ তাদের জন্য হইতোবা এই সিনেমাটা দেখা ভালো একপ্রেরিয়েন্স হবে না। তবে সত্যি যদি চাহনিরতে ভালোবাসার উষ্ণতা অনুভব করতে চান তবে অবশ্যয় দেখতে হবে এই সিনেমা।

অভিনয়ঃ

ঋত্বিক চক্রবর্তী, বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায়,

পরিচালকঃ

আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত

IMDB: 7.9/10 (275)

https://goo.gl/qAPQj0

চলচ্চিত্রের বংশীবাদক | অগস্ত লুমিয়ের – লুই লুমিয়ের

 

অগস্ত লুমিয়ের – লুই লুমিয়ের
অগস্ত লুমিয়ের – লুই লুমিয়ের

ফ্রান্সের লিয়ঁ শহরের চিত্রকর আঁতোয়া লুমিয়ের চিত্রকর্মে আর্থিক সুবিধা করতে পারছিলেন না। ফলে হুট করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন ছবি আঁকা ছেড়ে দেবেন। উপার্জন করাটা খুব বেশি জরুরী হয়ে পড়ছিল তাঁর। ফলে মনের গহীনে লালিত হওয়া আর্টের পথ ছেড়ে দিয়ে ফটোগ্রাফিক মাল মশলা তৈরি এবং এর সরবরাহ দেয়ার জন্য একটা প্রতিষ্ঠান খুলে বসলেন। রং তুলির শিল্পী মনের অজান্তে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বিস্ময়কর শিল্প মাধ্যম যাকে সপ্তম আর্টের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এবং যাকে ‘অষ্টম আশ্চর্য’ নামে সম্মানিত করা হয়েছে- সেই চলচ্চিত্র আবিষ্কারের পথটা সহজ ও সরল করে দিলেন এভাবেই। আজকের যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী এই শিল্প-মাধ্যমের আবিষ্কারের সঙ্গে ফ্রান্সের আঁতোয়া লুমিয়ের (১৮৪০-১৯১১) নাম কখনো উচ্চারিত হয় না বরং উচ্চারিত হয় তাঁর দুই সন্তান অগুস্ত লুমিয়ের (১৮৬২-১৯৫৪) এবং লুই লুমিয়েরের (১৮৬৪-১৯৪৮) নাম। কিন্তু আঁতোয়া’র মত পিতা না পেলে অগুস্ত এবং লুইয়ের সিনেমাটোগ্রাফের আবিস্কার হয়ত অনিশ্চিত হয়ে পড়তো আর স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবীর মানুষ চলচ্চিত্র শিল্পের স্বাদ আরো বিলম্বে পেতো।

ক্যামেরায় আঁতোয়া লুমিয়ের
ক্যামেরায় আঁতোয়া লুমিয়ের

আঁতোয়া লুমিয়ের রং-তুলি ছেড়েছিলেন এটা সত্য কিন্তু মনের মধ্যে প্রকৃতির যে সৌন্দর্য তাঁকে আলোড়িত করতো, সেই সৌন্দর্যের স্থায়িত্ব দেওয়ার জন্য তিনি ক্যামেরা হাতে নিয়েছিলেন এবং দীর্ঘ সাধনায় খ্যাতনামা ফটোগ্রাফারের স্তরে উন্নীত করলেন। আর অবিরাম পরিশ্রমে নিজের ফটোগ্রাফিক মান মশলা তৈরির প্রতিষ্ঠানটির আকার বড় হয়ে লাগলো। সে সময়ে প্রতিষ্ঠানটি হয়ে উঠে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফটোগ্রাফিক কারখানা। সবচেয়ে বড় কারখানা আমেরিকার নিউইয়র্কের জর্জ ইস্টম্যানের ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানির পরেই ছিল ের স্থান। আঁতোয়া লুমিয়ের’র দুই সন্তান আগুস্ত এবং লুই পিতার সঙ্গে মগ্ন হয়ে কাজ করতে শুরু করলেন নতু সৃষ্টির উদ্দীপনায়। বড় জন মুলত ম্যানেজারের ভূমিকা পালন করতেন আর ছোট জন পদার্থবিদ্যায় আবেশিত লুই নতুন আবিষ্কারের চিন্তায় মগ্ন রইলেন সারা সময়। তবে দুজনই ছিলেন একে অপরের পরিপূরক।

দাবা খেলায় মগ্ন অগুস্ত লুমিয়ের ও লুই লুমিয়ের
দাবা খেলায় মগ্ন অগুস্ত লুমিয়ের ও লুই লুমিয়ের

চলচ্চিত্র আবিষ্কারের শুরুর মাহেন্দ্রক্ষণটি ১৮৯৪ সালের গ্রীষ্মকালে। ইতোমধ্যে টমাস আলভা এডিসন (১৮৪৭-১৯৩১) ও ডব্লিউ কে এল ডিক্সন (১৮৬০-১৯৩৫) ১৮৮৮ সালে কিনোটোস্কোপ আবিস্কার করেছেন। পঞ্চাশ ফুট দৈর্ঘ্যের চলমান ছবি এই যন্ত্রের মাধ্যমে দেখা যেতো। বিশাল আকৃতির এই যন্ত্রটিতে কেবলমাত্র একজন এর ছবি দেখতে পেতেন। ১৮৯৪ গ্রীষ্মে টমাস আলভা এডিসন প্যারিসে কিনোটোস্কোপ-এর প্রদশর্নীতে আঁতোয়া লুমিয়েরকে আমন্ত্রণ জানালেন। প্রথমবারের মত তিনি কিনোটোস্কোপ প্রত্যক্ষ করে নিজ শহর লিয়ঁতে ফিরে এসে দুই সন্তানকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে শুধু বলেছিলেন, ‘তোমরা এর থেকে ভালো কিছু করার চেষ্টা কর। আমি তোমাদের সঙ্গে আছি’।

কিনোটোস্কোপ
কিনোটোস্কোপ

পিতার অনুপ্রেরণা গভীর উদ্দীপনার জন্ম দিল অগুস্ত ও লুই লুমিয়ের’র মনে। বিশেষ করে লুই যিনি পদার্থবিদ্যা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে ভালোবাসতেন। চলমান আলোকচিত্র গ্রহণের উপযোগী

ক্যামেরা আবিষ্কারের নেশায় দীর্ঘ গবেষণা ও পরিশ্রমের পর তিনি এক ধরণের ক্যামেরা ও প্রোজেক্টর যন্ত্রের আবিষ্কারে সফল হন। প্রখ্যাত সমালোচক ও চলচ্চিত্রের ঐতিহাসিক জর্জ সাঁসুল বলেছেন, লুই লুমিয়ের ডিটেলের প্রতি এত গভীর মনোযোগ দিয়েছিলেন বলেই প্রকৃত অর্থেই তাঁকে সত্যিকারের চলচ্চিত্রের প্রথম স্রষ্টা বলা য়ায। অগুস্ত লুমিয়েরও ছোট ভাইয়ের কৃতিত্ব বিন্যের সঙ্গে স্বীকার করে উল্লেখ করেছেন, তাঁর ভাই এক রাতের মধ্যে চলচ্চিত্র আবিষ্কার করেন। আর সেই রাতে সৃষ্টির বেদনায় লুই মাথার যন্ত্রণা এবং নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখেন খুবই কষ্ট পাচ্ছিলেন।

তবে এটা স্বীকার্য যে, চলচ্চিত্রের মত একটা জটিল বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হঠাৎ করে করো মাথায় এক রাতে আসেনি। বরং দীর্ঘ হাজার হাজার বছরে মানুষের চলমান দৃশ্যের স্থায়ী প্রতিফলনে যে স্বপ্ন ও আগ্রহ, এর ধারাবাহিকতার একটা চূড়ান্ত মুহূর্ত হতে পারে লুই লুমিয়ের’র অস্থির রাত।

‘সিনেমা’ শব্দটির উৎপত্তিগত বিষয়টি লক্ষ্য করলে আমাদের ফিরে যেতে হয় অনেক পেছনে। গ্রীক ‘কিনেমা’ শব্দটি থেকে ‘সিনেমা’ শব্দটি এসেছে; যার অর্থ ‘গতি’। আমরা যদি স্পেনের প্রাচীন গুহা আলতামিরায় ফিরে যায় তাহলে দেখি, একটি বাইসন দৌড়াচ্ছে; যার পায়ের সংখ্যা ছয়টি। দৌড়ানোর সময় নিশ্চয় আমাদের মনে হয় কোন প্রাণীর পায়ের সংখ্যা বেড়ে গেছে। হাজার হাজার বছরের প্রাচীন সেই গুহাশিল্পী হয়ত বাইসনের সেই গতির রূপটাই ধরতে চেয়েছিলেন।

লুমিয়েরদের ক্যামেরা
লুমিয়েরদের ক্যামেরা

যুগে যুগে আমরা গুহাচিত্র, ধোঁয়া-সংকেত (Smoke-Signal), চীনা ছায়া নাটক (Shadow-Play) বা মধ্যযুগের ম্যাজিক-লন্ঠনের (Magic-Lantern) মাঝে দেখি মানুষ কীভাবে ঘটমান গতিকে রূপ দিতে চেয়েছেন। কাঁচ ঘষে ছোট জিনিস বড় করে দেখা, অর্থাৎ ‘লেন্স’ আবিষ্কার, মানব সভ্যতার পুরনো এক আবিষ্কার। তবে ১৬৪০ সালে এথেন্সিয়াস কারচার তাঁর ম্যাজিক-লন্ঠনে যীশু’র জীবনের ঘটনাসমূহকে যখন একটা চলমান রূপ দেয়ার চেষ্টা নিয়েছিলেন, সেটাকে ঘটমান গতিকে ধরার একটা উল্লেখযোগ্য প্রয়াস বলতে হবে। আর এই ঘটমান গতিকে ধরাই হচ্ছে চলচ্চিত্র শিল্পের মূলকথা।

চলচ্চিত্র বিজ্ঞানের মূলসূত্র, ‘অবিরত দৃষ্টিতত্ত্ব’ (Persistence of Vision), প্রাচীনকাল থেকেই বিজ্ঞানীদের এই বিষয়টি ভাবিয়েছে। সহজভাবে বললে ‘অবিরত দৃষ্টিতত্ত্ব’ হচ্ছে- আমরা যখন একটা জিনিস দেখি এবং তা থেকে চোখ ফিরিয়ে অন্য আরেকটা ফিনিস দেখি; এ দুয়ের মাঝে আমাদের চোখে খুব সামান্য সময়ের জন্য হলেও(সেকেন্ডের ভগ্নাংশ) আগের দেখা চিত্রটার রেশ লেগে থাকে। চলচ্চিত্রে পর পর সাজানো একটা শট থেকে আরেকটা শটে দর্শককে টেনে নিয়ে যাওয়ার দৃষ্টি বিজ্ঞানগত ভিত্তিটা হচ্ছে- এই ‘অবিরত দৃষ্টিতত্ত্ব’। যুগে যুগে বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে মানুষের জ্ঞান বাড়াতে সাহায্য করেছেন। অ্যারিষ্টটাল ও আর্কিমিডিসের আলোকবিদ্যা, ইউক্লিডের আলোর গতির তত্ত্ব পেরিয়ে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ক্যামেরা ‘অবসকিউরা’-কে গ্রহণ করে, পরবর্তীকালে বিজ্ঞানীদের লেন্সের নানা গবেষণা এবং নিসেফোর নিপসের ফটোগ্রাফিক ইমেজকে ধারণ করে আজকের ফিল্ম ও চলচ্চিত্রের বিকাশের পথ সহজতর হয়। ফলে আজকের চলচ্চিত্রের আবিষ্কারের পথ হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের চিন্তা ও সাধনার সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য ঘটনা জরিয়ে রয়েছে। তারপরও যে সব সৃষ্টিশীল প্রাণে প্রত্যক্ষভাবে একে বর্তমান রূপ দিয়েছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে বলতে হয়, লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের ক্যামেরা, ইস্টম্যানের সংবেদনশীল ফিল্ম ও ম্যারের আবিস্কৃত প্রোজেক্টরের সংমিশ্রণেই আজকের চলচ্চিত্রের জন্ম। এর আগে প্রতিভাবান ক্যামেরাম্যান এতিয়েন মারে ফটোগান নামে রিপিট শট রাইফেলের মতো এক ধরনের ক্যামেরা আবিস্কার করেছিলেন যা দিয়ে পর পর গুলি ছোঁড়ার ভঙ্গিমায় এক সঙ্গে অনেকগুলা ফ্রেম শুট করা সম্ভাব ছিল। সে ক্যামেরা এখন আর ব্যবহৃত হয় না। কিন্তু চলচ্চিত্রের ‘শ্যুটিং’ শব্দটার উৎপত্তি ওখান থেকেই।

ওয়ার্কার্স লিভিং দ্য লুমিয়ের ফ্যাক্টরি
ওয়ার্কার্স লিভিং দ্য লুমিয়ের ফ্যাক্টরি

লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় তাদের প্রথম চলচ্চিত্রটি শ্যুট করেছিলেন ১৮৯৫ সালের ১৯ মার্চ। ১৫ মার্চ থেকে ২০ মার্চের মধ্যে তারা তাদের প্রথম চলচ্চিত্রটির সব কাজ শেষ করেন। ছবিটির নাম ওয়ার্কার্স লিভিং দ্য লুমিয়ের ফ্যাক্টরি। ওই দিনের যেহেতু ১৯ তারিখে ছাড়া প্রতিদিন বৃষ্টি হয়েছিলো সে জন্য ধারণা করা হয় সেই দিনই পৃথিবীর ইতিহাসে লুমিয়েরদের দ্বারা প্রথম ছবির শ্যুটিং হয়ছিল। মাত্র ৪৬ সেকেন্ডের ছবিটিতে দেখা যায় লুমিয়েরদের কারখানা থেকে শ্রমিকরা বের হচ্ছেন যাদের অধিকাংশই ছিলেন নারী শ্রমিক। তারা যখন কারখানা থেকে বের হচ্ছিলেন তখন কেউ-ই ক্যামেরার দিকে তাকাননি। ফলে ধারণা করা হয় তারা শ্যুটিং এর বিষয়টা জানতেন। শ্রমিক ছাড়াও ছবিটিতে দেখা যায় একটা কুকুর, একটা বাইসাইকেল এবং দুটো ঘোড়া। ফলে স্বাভাবতই বলা যায়, চলচ্চিত্রের প্রথম চরিত্র হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণী, কুকুর এবং ঘোড়া। পরবর্তীতে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় একক শর্টের মোট ১৪২৫টা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন; যার কোনটিরই দৈর্ঘ্য এক মিনিটের ঊর্ধ্বে নয়। তাদের ছবিগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-

  • এ ট্রেন রিচেস দ্য স্টেশন
  • এ বোট লিভস্ দ্য হারভার
  • বেবি অ্যাট ব্রেকফাস্ট টেবিল
  • ওয়াটারিং দ্য গার্ডের
  • হর্স ট্রিকস্
  • রাইর্ডাস
  • ফিশিং ফর গোল্ড ফিশ
  • ব্লাকস্মিথস্
  • জাম্পিং অন দ্য ব্লাংকেট
পৃথিবীর চলচ্চিত্রের প্রথম পোস্টের
পৃথিবীর চলচ্চিত্রের প্রথম পোস্টের

১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্যারিসের গ্র্যান্ড ক্যাফেতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম বারের মত অগুস্ত লুমিয়ের কুড়ি মিনিটের অনুষ্ঠানে তাঁদের নির্মিত দশটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী করেন। এরপর তারা প্যারিসের একটা প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেন। প্রথম কয়েকদিন দর্শকদের বিশেষ কোন ভিড় হয়নি, তারপর ধীরে ধীরে এটা এমনই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে যে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার ঢেউ ছড়িয়ে গোটা দুনিয়া জুড়ে।

লুমিয়েররা যথেষ্ট বুদ্ধিমান ও পাকা ব্যবসায়ীর মতো আগের বেশ কয়েকটি ক্যামেরা ও প্রোজেক্টর তৈরি করে রেখেছিলেন। তাদের বিশ্বাসী কিছু লোককে ক্যামেরাম্যান ও প্রোজেক্টর অপারেটরের কাজও শিখিয়ে রেখেছিলেন। এসব ট্রেনিংপ্রাপ্ত লোকদের মাধ্যমে লুমিয়েররা তাদের আবিষ্কৃত চলচ্চিত্র পাঠাতে লাগলেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।

ভারতবর্ষে লুমিয়েরদের প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হলো বোম্বাই শহরে ১৮৯৬ সালের ৭ জুলাই। যে কয়েকটি স্বল্প দৈর্ঘ্যর ছবি তখন দেখানো হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-

  • এ্যারাইভাল অফ এ ট্রেন
  • সী বেদার্স
  • লন্ডন গার্ল ড্যান্সার্স
  • ওয়াটারিং দ্য গার্ডেন

কোলকাতায় ছবিগুলা দেখানো হয় পরের বছর অর্থাৎ ১৮৯৭ সালে। ১৮৯৮ সালের ১৭ এপ্রিল বেডফোর্ড সিনেমাটোগ্রাফ কোম্পানি ঢাকায় ক্রাউন থিয়েটারে প্রথম চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী করে।

লুমিয়েররা আর্ক- লাইট প্রজেক্টরে তাঁদের ছবি দেখতেন। প্রতি সেকেন্ডে ১৬ ফ্রেম করে ছবি পর্দায় পড়তো। বর্তমানে প্রতি সেকেন্ডে ২৪ ফ্রেম করে পড়ে থাকে। ফলে তাদের ছবিগুলো দেখলে মনে হয় চরিত্ররা ছুটোছুটি করছে অর্থাৎ ফাস্ট মোশন হচ্ছে।

লুমিয়েরদের ১৪২৫টি ছবির মাধ্যমে সেই সময়ের ফ্রান্সের একটি চিত্র পাওয়া যায়। এর আগে ফটোগ্রাফি আবিস্কার হয়েছে ফলে স্থিরচিত্রের মাধ্যমে একটা সময়কে বুঝতে পারলেও চলচ্চিত্রের আবেদন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁদের এই ছবিতে কখনো কোন পেশাদার অভিনেতা বা অভিনেত্রীদের ক্যামেরার সামনে আনা হয়নি। বরং তাঁদের ঘর বাড়ি, রাস্তাঘাট থেকে আশেপাশের বিভিন্ন ধরনের সব ছবি তোলা হয়েছে। বেবী এ্য ব্রেকফাস্ট টেবিল এ দেখা যায়, স্বয়ং অঁগুস্ত লুমিয়ের ক্যামেরার সামনে। খাবার টেবিলে তাঁর বাম পাশে বসে থাকা একজন শিশুকে চা খাওয়াচ্ছেন। শিশুর পাশে বসে আছেন মার্গারেট নামের এক মহিলা। চিত্রে তিনজনের এই অন্তরঙ্গতা দেখে অনুমান করতে ভুল হয় না যে অঁগুস্ত লুমিরেরের পরিবার। ছবিতে বোঝা যায় ঘরের বাইরে লনে বসে তারা তাদের নাস্তা খাচ্ছেন। পেছনে গাছের দুলে ওঠা পাতার স্তির থেকে ছবিটি তোলা হয়েছে।

ওয়াটারিং দ্য গার্ডেন
ওয়াটারিং দ্য গার্ডেন

চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম কমেডি হচ্ছে ওয়াটারিং দ্য গার্ডেন ছবিটি। বাগানে মালি পাইপের মাধ্যমে ফুলের গাছে পানি দিচ্ছে। মগ্ন মালি যখন ব্যস্ত। তখনই এক দুষ্ট বালক পিছন থেকে এসে পাইপে পা দিয়ে চেপে ধরে। পানি বের না হওয়ায় মালি পাইপের নলে চোখ লাগিয়ে দেখার চেষ্টা করার সময়ই বালকটি পা টেনে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে পানির ঝাঁপটায় মালির চোখ মুখ আর কাপড় ভিজে যায়। তারপর শুরু হয় মালির ছেলেটিকে পাকড়াও করার দৃশ্য। ১৮৯৫ সালের ২৮  ডিসেম্বর লুমিয়ের ব্রাদার্সের প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে এই ছবিটি দেখানো হয় যা চলচ্চিত্রের মত নতুন একটা আবিস্কার দেখতে আসা উৎকণ্ঠিত দর্শকদের হাসির উপাদান যোগায়।

চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম কমার্শিয়ালও লুমিয়েররা তৈরি করেন। কমার্শিয়ালটির নাম কার্ড গেম তবে আশ্চর্যের বিষয় বিয়ারের এই বিজ্ঞাপন চিত্রে পর্দায় দেখা যায় লুমিয়েদের বাবা আঁতোয়া লুমিয়েরের এবং শ্বশুর ভ্যানক্লোয়ারকে। উল্লেখ্য, ভ্যানক্লোয়ারের দুই কন্যাকে দুই ভাই বিয়ে করেছিলেন। তাদের সাথে আরেকজন বসে তাস খেলছিলেন তবে তাঁর কোন পরিচয় পাওয়া যায় না। এই তিনজন ছাড়াও ফ্রেমে ওয়েটার থাকে যে বিয়ারের গুণগান বর্ণনা করতে দিয়ে অতি নাটকীয়ভাবে অভিনয় করেন।

লুমিয়েরদের তৈরি প্রথম মাস্টারপিস বলা যেতে পারে এ ট্রেন রিচেস দ্য স্টেশন ছবিটি। ফ্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢুকছে ক্যামেরা স্থির করে একই জায়গায় রাখা হয়েছে। কিন্তু ছবির কম্পজিশন ও ফ্রেমিং সত্যিই অপূর্ব। ট্রেন থামার পর যাত্রীর উঠানামা এবং ক্যামেরার সামনে দিয়ে যাত্রীদের একা অথবা দলবদ্ধভাবে হেঁটে চলা এত ছন্দময় যে দর্শকদের অভিভুত হতে হয়। সেই সাথে সাদাকালো রঙের ব্যবহার ছবিটির আবেদন অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। লুই লুমিয়ের নিজেই একজন খুব দক্ষ ফটোগ্রাফার ছিলেন। ফলে তাঁর মধ্যে ফ্রেমিং ের ধারণা খুবই সূক্ষ্ম ও যাথার্থ ছিল।

প্রথম দিককার কিছু ছবিতে ক্যামেরা স্থির থাকলেও পরের বেশ কিছু ছবিতে ক্যামেরা মুভ করেছে। এমনই একটি ছবিতে দেখা যায় ট্রামের লাইন ধরে ক্যামেরা এগিয়ে যাচ্ছে। সেই সময়কার প্যারিসের রাস্তার চিত্র ভেসে আসে পর্দায়। প্যারিসের রাস্তার ইতিহাসও খুঁজে পাওয়া যায় এ ছবিটি। মোটর গাড়ির পাশাপাশি ট্রাম এবং বিভিন্ন ধরনের ঘোড়ার গাড়ি দেখা যায় এই ছবিতে এবং সেই সাথে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়া পথচারী।

লুমিয়েরদের আরেকটি বিখ্যাত ছবি বয়েজ অন দ্য স্ট্রিট। ছবিটি সেই সময়ের ফ্রান্সের আর্থ-সামাজিক চিত্র দর্শকদের কাছে তুলে ধরে। ফুটপাতের ক্ষুধার্ত বালকগুলো একটি বল নিয়ে খেলছে। তাদের মধ্যে কেউ আবার মারামারি করছে। ছবিটি দেখে মনে হয় একশ বছর আগে ফ্রান্সের অসংখ্য শিশুর অবস্থা বর্তমানে আমাদের দেশে পথে পথে ঘুরে বেড়ানো শিশুদের মত ছিল।

ফ্রান্সের আভ্যন্তরীণ জীবন যাত্রা ক্যামেরায় তুলে ধরার পর লুমিয়েররা ক্যামেরা নিয়ে ফ্রান্স থেকে বের হলেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। আমেরিকা এমনকি মিশরে গেলেন ছবি তুলতে। মানুষজন, প্রাণী, রাস্তাঘাট, নদী, বন, সৈনিকদের ছবি তোলার সাথে সাথে সার্কাস দলেরও ছবি তুলছেন। মিশরে গিয়ে তুললেন পিরামিড ও স্ফিংস এর ছবি। ফলে তাদের ছবিগুলো নিছক বিনোদনের মাধ্যমে হলো না, বরং হলো এক ঐতিহাসিক দলিল।

এ্যারাইভাল অফ এ ট্রেন
এ্যারাইভাল অফ এ ট্রেন

অগুস্ত লুমিয়ের এবং লুই লুমিয়ের-এর অদ্ভুত আবিস্কার যখন পৃথিবীর মানুষের বিস্ময় সৃষ্টি করেছে এবং তাদের প্রচুর বিত্ত-বৈভবের মালিক বানিয়েছে, তখন বাবা আঁতোয়া লুমিয়ের নীরবে সন্তানদের সাফল্য দেখেছেন আর মনের আনন্দে সুখ অনুভব করেছেন। তিনি খুব গর্ব অনুভব করতেন যে, তাঁর দুই সন্তান তাঁর কথা রেখে পৃথিবীর মানুষের কাছে সম্মানিত করেছেন।

তরুণ বয়সে যে আঁতোয়া লুমিয়েরের গভীর উদ্দীপনা ছিল রং তুমি নিয়ে ছবি আঁকায়, তিনি জীবনের মাঝখানে নিজেকে ছবি আঁকা থেকে গুঁটিয়ে নিয়েছিলেন মূলত আর্থিক কারণে। তবে সন্তানদের সাফল্য এবং চলচ্চিত্র নিয়ে তাঁর স্বপ্ন পূরণ তাকে আবার পুরদস্তুর চিত্রশিল্পী বানিয়েছিল। ১৯১১ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি প্রায় সব সময়ই ছবি আঁকায় নিমগ্ন থাকতেন।

লুমিয়েরদের প্রদর্শিত প্রথম দশটি ছবিঃ

  • প্রান্ড ক্যাফে, প্যারিস
  • ওয়ার্কাস লিভিং দি লুমিয়ের ফ্যাক্টরি
  • হর্স ট্রিকস্ রাইডার
  • ফিশিং ফর গোল্ডফিশ
  • দ্য ডিজএমবার্কমেন্ট অফ দ্য কংগ্রেস অফ ফটোগ্রাফার্স ইন লিয়ঁ
  • ব্লাকস্মিথস্
  • দ্য গার্ডেনার
  • বেবী’স ব্রেকফাস্ট
  • জাম্পিং অন টু দ্য ব্লাংকেট
  • কার্ডিয়ার্স স্কোয়ার ইন লিয়ঁ
  • বাথিং ইন দ্য সি